অর্থনীতি

আমদানিতে জোর, প্রতি ইউনিয়নে নতুন ডিলার

  • প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬
  • সরানো হলো কৃষির অতিরিক্ত সচিবকে
  • বহাল থাকবেন আগের ডিলাররাও

    সার সংকট নিরসন এবং কৃষকদের দোরগোড়ায় সঠিক সময়ে সার পৌঁছে দিতে একগুচ্ছ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যার অংশ হিসেবে গতকাল শনিবার রাতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমামকে। তিনি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাকে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে।

    আহমেদ ফয়সাল ইমাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার আসামি সাবেক মন্ত্রী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতা অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, চলমান সার সংকটে তার গাফিলতি ও সম্পৃক্ততা ছিল।

    অন্যদিকে কৃষকদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে সার বিতরণে প্রতি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেবে সরকার। সেই ডিলার তার মনমতো দুজন প্রতিনিধি সেখানে নিয়োগ দিতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মাধ্যমে তা নির্ধারণ করা হবে। আজ রবিবার জারি হবে এ-সংক্রান্ত পরিপত্র। তবে আগের সরকারের সময়ে নিয়োগ হওয়া সার ডিলাররাও বহাল থাকবেন। গতকাল রাতে আগামীর সময়কে এ তথ্য জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।

    এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরি আমদানির পথে এগোচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দ্রুত সার আনতে জোর দেওয়া হচ্ছে সরকার টু সরকার (জিটুজি) চুক্তিতে।

    সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসন্ন রবি ও বোরো মৌসুমে ইউরিয়া এবং ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং চাহিদার বিপরীতে মজুদ নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ‘পিক মৌসুম’ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি— এই চার মাসে শুধু ডিএপি সারের চাহিদা দাঁড়াবে ৮ লাখ ৭০ হাজার টন। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) গুদামগুলোতে মজুদ রয়েছে ৩ লাখ ৩৫ হাজার টন, যা দিয়ে শুধু অক্টোবর পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের চাহিদা মেটানো সম্ভব। অন্যদিকে যেকোনো আকস্মিক সরবরাহ বিঘ্ন সামাল দিতে অন্তত ৫ লাখ টন ইউরিয়া সারের নিরাপত্তা মজুদ রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত আমদানির জন্য চুক্তি হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার টনের। এ প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক মজুদ কম এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানির গতি ধরে রাখা এখন নীতিনির্ধারকরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

    সরকারি উচ্চপর্যায়ের নথি ও বিসিআইসির দাপ্তরিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়মতো সার না এলে চাল উৎপাদন করা অঞ্চলগুলোতে সরবরাহ ভেঙে পড়ে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতে পারে। কারণ পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও আমদানিতে বিলম্ব, বৈশ্বিক লজিস্টিক জটিলতা এবং দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস সংকটের কারণে দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা নেমে এসেছে তলানিতে।

    সার সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সচিব সেলিম খান আগামীর সময়কে বললেন, ‘সার্বিক পর্যালোচনায় একটি উচ্চপর্যায়ের মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়াতে জেলা সার মনিটরিং কমিটিকে চিঠি দিয়ে সক্রিয় করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের কাজে লাগোনো হচ্ছে।’

    চাহিদা মেটাতে সম্প্রতি ৪০ হাজার টন ইউরিয়া এবং ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির অনুমোদনের জন্য দুটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করা হয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। সেখানে সার মজুদ ও আমদানির তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, কৃষি খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে চলতি অর্থবছরে (২৬-২০২৭) মোট ইউরিয়া সারের চাহিদা নির্ধারণ করেছে ২৬ দশমিক ২০ লাখ টন। একই সঙ্গে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির কারণে সরবরাহে বিঘ্ন মোকাবিলায় কমপক্ষে ৫ লাখ টন সার নিরাপত্তা হিসেবে মজুদ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে দেশে মোট ৩১ দশমিক ২০ লাখ টন সারের নিট প্রয়োজন। তবে স্থানীয় উৎপাদনে গ্যাস সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে যথাসময়ে সার এসে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় যেকোনো বিলম্ব কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতির ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

    কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই সারসংক্ষেপে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনাকাটা, জাহাজীকরণ ও দেশে এনে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে গড়ে ৮০-৯০ দিন সময়ের প্রয়োজন। তাই এখনই জরুরি ভিত্তিতে আমদানি নিশ্চিত করা না গেলে আসন্ন মৌসুমে দেশ জুড়ে সারের ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

    এরই মধ্যে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘সাবিক’-এর সঙ্গে ৮ দশমিক ২০ লাখ টন ইউরিয়া সারের চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় ৩ দশমিক ২০ লাখ টন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং ৫ লাখ টন জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের যোগ্য হিসেবে নির্ধারিত। সে চুক্তির আওতায় ৪০ হাজার টন আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। প্রতি টন এফওবি দর নির্ধারিত হয়েছে ৩৮০ মার্কিন ডলার।

    ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডিএপি সারের চাহিদা ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টন। তবে জরুরি জাতীয় প্রয়োজনে অতিরিক্ত ৫ লাখ টন ‘নিরাপত্তা মজুদ’ রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছরে বিএডিসিকে মোট ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টন সারের সংস্থান করতে হবে।

    বছরের শুরুতে বিএডিসির কাছে প্রারম্ভিক মজুদ ছিল ৩ দশমিক ৯৪ লাখ টন। দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) থেকে বছরে পাওয়া যাবে প্রায় ১ লাখ টন এবং বেসরকারি খাত সরবরাহ করবে ৫ লাখ টন। ফলে অবশিষ্ট ৯ দশমিক ৯১ লাখ টন ডিএপি সার সরাসরি বিএডিসিকে আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সৌদি আরবের মায়াদেন থেকে মাত্র ৪০ হাজার টন এবং মরক্কোর ওসিপি নিউট্রি ক্রপস থেকে ১ দশমিক ২০ লাখসহ মোট ১ দশমিক ৬০ লাখ টন সার আমদানির অনুমোদন পাওয়া গেছে।

    প্রতি ইউনিয়নে নিয়োগ হবে নতুন ডিলার: গতকাল পঞ্চগড় সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আয়োজনে জেলার সব ইউএনও, ওসিসহ নিবন্ধিত রাসায়নিক সার ডিলারদের সঙ্গে সরবরাহ, বিতরণ, মজুদ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনাবিষয়ক মতবিনিময় সভা করেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী। সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিগত দিনে একটি দলীয় মতের সার ডিলার ছিলেন অনেকেই। তারা বহাল থাকবেন। তবে সার সুষ্ঠুভাবে বিতরণের লক্ষ্যে এখন প্রতি ইউনিয়নে একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। একজন নিজ গ্রামের নিজ ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে এই ডিলার হওয়ার সুযোগ পাবেন।’

    আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দাম ও রাজস্ব চাপ: মরক্কোর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘ওসিপি নিউট্রি ক্রপস’-এর সঙ্গে গত ২৫ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, সরকারি পর্যায়ে ৫ দশমিক ৬০ লাখ টন ডিএপি সার আনার সংস্থান রয়েছে (যার মধ্যে ৩ দশমিক ২০ লাখ টন নিশ্চিত এবং ২ দশমিক ৪০ লাখ টন ঐচ্ছিক)। এর মধ্যে সম্প্রতি চতুর্থ লটের জন্য প্রতি টন সারের দাম ধরা হয়েছে ৮৯৪ মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা— আরগুস ফসফেট, ফার্টিকন ও প্রফার্সির এফওবি মূল্যের গড়ের ওপর ভিত্তি করে এই দর নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু ৪০ হাজার টনের এই একটি লটে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ৪৪৩ কোটি ৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। বিএডিসির তথ্য বলছে, গত লটের (তৃতীয় লট) তুলনায় এবার প্রতি টনের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৩৩ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের এমন ঊর্ধ্বগতি এবং ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা সরকারি ভর্তুকি বাজেটের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

    চলতি অর্থবছরে কৃষি খাতে ভর্তুকি বাবদ মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। গত ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের হাতে অবশিষ্ট রয়েছে ১১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment