পাইকগাছায় প্রধান শিক্ষকের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ! দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে ফুঁসছে এলাকাবাসী

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি • দৈনিক পূর্বাচল

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬

খুলনার পাইকগাছায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভারতীয় নাগরিকত্ব থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। শুধু দ্বৈত নাগরিকত্বই নয়, ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্কুলের তহবিল তছরূপ, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সরকারি একাধিক তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে চাকরিতে থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া নবারুন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার একইসঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিক। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ ভোটার তালিকায় তার নাম রয়েছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, দীপক চন্দ্র সরকার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর বর্ধমানের শক্তিগড় থানার ২ নং বরশুল গ্রামের ১ নং মনমোহন দে রোডের পশ্চিমাংশের স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার। অন্যদিকে, তিনি বাংলাদেশে পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামেরও ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত। শুধু তিনি একাই নন; তার স্ত্রী অপর্ণা সরকার, মেয়ে জয়শ্রী সরকার, বড় ভাই দুলাল চন্দ্র সরকার ও তার স্ত্রী সুশীলা সরকার এবং ছোট ভাই তাপস সরকার ও তার স্ত্রী বর্ণালী সরকারও ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা ও সেখানকার নিয়মিত ভোটার।

স্কুলকে পুঁজি করে ওপারে অর্থ পাচারের অভিযোগ

এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক দীপক তার পরিবারের সব সদস্যকে গোপনে ভারতে পাঠিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করাচ্ছেন। আর নিজে বাংলাদেশে থেকে স্কুলকে ‘টাকা বানানোর মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। ২০২৪ সালে স্বজনপ্রীতি ও মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে স্কুলে পরিচ্ছন্নতা কর্মী, নিরাপত্তা কর্মী ও আয়া নিয়োগ দিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এই গোপন নিয়োগের খবর জানাজানি হলে সে সময় গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে মিছিল, সমাবেশ এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন।

এছাড়া, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে স্কুলের প্রণোদনা অনুদান বাবদ বরাদ্দকৃত ৫ লাখ টাকা খরচের ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা নামমাত্র খরচ করা হলেও বাকি ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কোনো সঠিক বিল-ভাউচার বা কাজের মান পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা প্রকাশ চন্দ্র সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হেড স্যারের দুর্নীতির শেষ নেই। তিনি ভারতের নাগরিক। এখানকার নিয়োগ বাণিজ্য আর স্কুলের টাকা লুটে নিয়ে তিনি ওপারে পাচার করছেন। প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না।”

তদন্তে সত্যতা মিললেও ব্যবস্থা নিতে ‘ধীরগতি’

সরকারি নথি ঘেঁটে দেখা যায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন উপজেলা রিসোর্স অফিসার মো. ঈমান উদ্দিন। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি এবং একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা অফিসার এস এম ছায়েদুর রহমান পুনরায় তদন্ত করে অনিয়মের সত্যতা পান।

সর্বশেষ চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসক বরাবর প্রেরিত এক প্রতিবেদনে পাইকগাছার ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী স্পষ্ট উল্লেখ করেন, প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতীয় নাগরিকত্ব রয়েছে। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। ফলে একজন বিদেশী নাগরিকের এমপিওভুক্ত পদে থাকা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বিতর্কিত।

ইউএনও’র এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি পাঠান। তবে অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর এই বিষয়ের চার মাস পেরিয়ে গেলেও মাউশি থেকে এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। দৈনিক পূর্বাচল-কে তিনি বলেন, “আমি ভারতের ভোটার নই, আমি বাংলাদেশের নাগরিক। স্কুলের অনুদান আত্মসাৎ কিংবা নিয়োগ বাণিজ্য সংক্রান্ত যেসব কথা বলা হচ্ছে, তার কোনোটিই সত্য নয়

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 3   +   5   =