APORAD

সাভারে ডিবির অভিযানে অনিয়ম: ৩৮ লাখ টাকার বিনিময়ে মাদক কারবারিদের মুক্তির অভিযোগ | দৈনিক পূর্বাচল

বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক পূর্বাচল:

সাভার ও আশুলিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কোটি টাকার আটক বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে। বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলে।

শিল্পাঞ্চল সাভারে প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে মাদকের ভয়াল থাবা। নিয়মিত অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা মামলা দায়ের করা হলেও কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না এর বিস্তার। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চরম ব্যর্থতার নেপথ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণীর কর্মকর্তার অনিয়ম ও অপেশাদার কর্মকাণ্ড। সাভারে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি বিশেষ দলের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে ডিবির একটি নির্দিষ্ট অভিযানিক দল বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে—উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও হেরোইন টাকার বিনিময়ে গায়েব করে দেওয়া হয় কিংবা সামান্য পরিমাণ গাঁজা উদ্ধার দেখিয়ে হালকা ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

জিম্মি করে টাকা আদায় ও সাজানো মামলার অভিযোগ

গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকা থেকে এক নারীকে আটক করেন এসআই মতিউর ও তাঁর দল। তল্লাশিতে কিছু না পাওয়া গেলেও জবরদস্তিমূলকভাবে হেরোইন হাতে দিয়ে তাঁর ছবি তোলা হয় এবং ৫ লাখ টাকা দাবি করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগী নারী জানান, ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং আগামী তিন বছর নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার ‘আশ্বাস’ দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলের এক প্রত্যক্ষদর্শীও নিশ্চিত করেছেন যে আটকের সময় ওই নারীর কাছ থেকে কোনো মাদক উদ্ধার হতে দেখা যায়নি।

একইভাবে গত ৩০ আগস্ট আশুলিয়ার কাইচাবাড়ি থেকে ১ হাজার পিস ইয়াবা ও ৪ কেজি গাঁজাসহ জাফর এবং নাছিমা নামের দুই কারবারিকে আটক করা হয়। সূত্র জানায়, ডিবি কার্যালয়ের নিকটবর্তী একটি বিকাশের দোকানের মাধ্যমে ৭ লাখ টাকা নিয়ে নাছিমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আটক জাফরকে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকার বিনিময়ে মাত্র আধা কেজি গাঁজা দেখিয়ে মামলা দেওয়া হয়, যার বড় একটি অংশ ব্র্যাক ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে উত্তোলন করা হয়।

বরদেশী, আমিনবাজার ও কাউন্দিয়ায় ‘আটক বাণিজ্য’

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আমিনবাজার, কাউন্দিয়া, শ্রীপুর ও মজিতপুর এলাকায় এলাকাভিত্তিক সোর্স নিয়োগ করে এই আটক বাণিজ্য চালানো হচ্ছে:

  • ৯ সেপ্টেম্বর (বরদেশী): ৫০০ পিস ইয়াবাসহ ‘হাতকাটা’ নামের এক কারবারিকে ধরে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাত্র ৫০ পিস ইয়াবা দিয়ে চালান করা হয়।

  • ৭ আগস্ট (আমিনবাজার): ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ জাহি ও তাঁর ছেলেকে আটক করে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ১০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

  • ৮ সেপ্টেম্বর (কাউন্দিয়া): সোর্স ব্যবহারের মাধ্যমে এক মাদক কারবারির বাবা-মাকে আটক করে ৩ লাখ ৪ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

  • ৪ আগস্ট (মজিতপুর ও শ্রীপুর): মজিতপুরে ৩৫০ পিস ইয়াবাসহ দুই ভাইকে আটক করে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং শ্রীপুরে ২৫ গ্রাম হেরোইনসহ দুইজনকে ধরে ২ লাখ টাকার বিনিময়ে মুক্তি দেওয়া হয়।

দীর্ঘদিনের নেটওয়ার্ক ও দায়িত্বরতদের বক্তব্য

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডিবি পুলিশের এসআই মতিউর রহমান এবং এএসআই মেহেদী। এএসআই মেহেদী দীর্ঘ ৪ বছর ধরে একই কর্মস্থলে কর্মরত থাকায় এক শক্তিশালী সোর্স নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন বলে জানা গেছে।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মতিউর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে ‘মিথ্যা’ দাবি করেন এবং প্রতিবেদকের সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার প্রস্তাব দেন।

ঢাকা জেলা (উত্তর) ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুল ইসলাম জানান, “এ ব্যাপারে আমার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে এ বিষয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) জাহিদুল ইসলাম খানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment