‘হামরা (আমরা) গরিব মানুষ। মানুষের জমিত (জমিতে) কাম করি খাই। কিসের হামার (আমার) দিবস-টিবস। কাম করলে হামার পেটোত (পেটে) ভাত যায়, না করলে নাই। হামরা এগলে দিবস কী করি (আমরা এ দিবস দিয়ে কী করবো)?’ মে দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে এভাবেই আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন দিনমজুর সনঞ্জু মিয়া (৬৫)।
দিনমজুর সনঞ্জু মিয়ার বাড়ি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সিংপুর গ্রামে। এই গ্রাম দিয়ে বয়ে গেছে ধনু নদী। নদীটি অনেকের জন্য আশীর্বাদ হলেও সনঞ্জু মিয়াকে করেছে নিঃস্ব। তার বাপ-দাদার অনেক জমি ছিল। ছিল গোয়ালভরা গরু-ছাগল। একবার দুবার নয়, পাঁচবার ভিটেমাটিসহ আবাদি জমি সর্বগ্রাসী করেছে এই ধনু নদী।
সনঞ্জু মিয়া জমিতে এখনো কোনো ফসল হয় না। তাইতো তিনি দিনমজুরি করে সাত সদস্যের সংসার চালান। যদি কখনো কাজ না পান, তখন খাবার ঝুটাতে কষ্ট হয়ে যায়। ঘরে আছে অসুস্থ মা। তার ওষুধের পেছনে যায় অনেক টাকা।
এ গল্প শুধু দিনমজুর সাজু মিয়ার একার নয়, দারিদ্র্যপীড়িত কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলার কয়েক হাজার মানুষের গল্প এটি। ধনু নদীর করাল গ্রাসে ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই সনঞ্জু মিয়ার মতো দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।
মনির উদ্দিন নামের একজন নির্মাণশ্রমিক তার একটি ছবি তুলতে চাইলে তিনি ছবি না নিষেধ করেন। মে দিবস নিয়ে তিনি বলেন, ‘মে দিবস কী ভাই? এই দিবস কি আমাদের ভাত-কাপড় দিবে?’
মনির উদ্দিন বলেন, ‘একদিন কাজ না করলে হামার সংসার চলা দায় হয়ে যায়। দিনমজুরি করে যা পাই তা দিয়ে কোনোমতে জীবন বাঁচাই। পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভাত, কাপড় আর ছেলে-মেয়ের নেকাপড়ার (পড়ালেখা) খরচ জোগাড় করতে সারাদিন মানুষের বাড়িত কাম করি।’
ইটভাটায় কাজ করেন মরজিনা বেগম। দুই সন্তান রেখে তার স্বামী পাঁচ বছর আগে অন্যত্র গিয়ে একজনকে বিয়ে করে ঘর সংসার করছেন। পাঁচ বছর থেকে মরজিনা বেগম ও দুই সন্তানের কোনো খোঁজখবর রাখেন না। সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে মরজিনা বেগম ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন। তিনি সেখানেও প্রতিনিয়ত শ্রম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন বলে দাবি তার।
মরজিনা বেগম বলেন, ‘ইটভাটায় কাম করা আর জাহান্নামের আগুনোত পোড়া সমান কথা। লম্পট স্বামী দুইটা ছেলে আমার ঘাড়ত (ঘাড়ে) চাপে দিয়ে আরেকটা বিয়া করছে। ছেলে দুইটের মুখের দিকে তাকায়য়া আগুনে পুড়ি সারাদিন কাম করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেটা মানুষ (পুরুষ) সাথে হামরাও সমান কাম করি। তবুও ভাটার মালিকরা হামাক হাফ কামলার দাম দেয়। বেটি মানুষ (মেয়ে) জন্যে হামাক ঠকায়। তাদের বুঝা উচিত হামরাও মানুষ, হামারও একটা সংসার আছে।’
ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালক আব্দুল কাসেম বলেন, প্রতিদিন ঘুম থাকি উঠিয়ে অটো নিয়ে বের হয়ে রাতে বাড়িতে ফিরি। যা কামাই হয় তাকে তা দিয়েই সংসার চালাই। খালি শুনি মে দিবস, শ্রমিক দিবস। এই দিবসে কী হয়, কেন হয়, তা কিছুই জানি না। হামার অটোর চাকা একদিন না ঘুরলে পেটোত টান পড়ি যায়।


