সোশাল মিডিয়ার হুজুগে পুরুষ উর্বরতা বৃদ্ধির হিড়িক: চিকিৎসকদের উদ্বেগ

বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক পূর্বাচল:

টিকটক-ইনস্টাগ্রামের তথাকথিত ইনফ্লুয়েন্সারদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ে পুরুষ উর্বরতা বাড়াতে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন তরুণেরা। এই স্বাস্থ্য আতঙ্ক নিয়ে কী বলছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা? বিস্তারিত পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলে।

সোশাল মিডিয়ার কনটেন্ট ও বিভিন্ন ইনফ্লুয়েন্সারদের প্ররোচনায় পড়ে বিশ্বজুড়ে তরুণ ও পুরুষদের মাঝে শুক্রাণুর সংখ্যা (Sperm Count) এবং প্রজনন ক্ষমতা রক্ষা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে পুরুষের উর্বরতা সম্পর্কিত বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ এখন শত কোটি ভিউ পাচ্ছে। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, এই সামষ্টিক আতঙ্ককে পুঁজি করে বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠেছে কোটি ডলারের এক অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক বাজার, যেখানে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়াই ক্ষতিকর ও অপ্রমাণিত নানা ঘরোয়া পদ্ধতি এবং সাপ্লিমেন্ট বিক্রি করা হচ্ছে।

আতঙ্ক ছড়াচ্ছে সোশাল মিডিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার বাসিন্দা সাইমন (২৮)। বর্তমানে কোনো সঙ্গী কিংবা অদূর ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও কেবল সোশাল মিডিয়ার কনটেন্ট দেখে নিজের প্রজনন ক্ষমতা নিয়ে চরম আতঙ্কে ভুগছেন তিনি। উর্বরতা ঠিক রাখতে তিনি প্রতিদিন সকালে স্টিম বাথ নেওয়া, অণ্ডকোষে বরফের প্যাক ব্যবহার করা এবং দামি সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার মতো একটি কঠোর ও ব্যয়বহুল রুটিন মেনে চলছেন।

সাইমনের মতো লাখ লাখ তরুণ সিলিকন ভ্যালির বহুল আলোচিত বিলিয়নিয়ার ব্রায়ান জনসন কিংবা পডকাস্টার অ্যান্ড্রু হিউবারম্যানের মতো সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। এসব ইনফ্লুয়েন্সাররা দাবি করছেন, আধুনিক বিশ্বে পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। নিজেদের দাবির সপক্ষে তারা বৈজ্ঞানিক প্রমাণহীন বিভিন্ন থেরাপি যেমন— রেড লাইট থেরাপি (অণ্ডকোষে বিশেষ লাল আলো দেওয়া) কিংবা শরীর থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করার নামে নিয়মিত রক্তদানের মতো অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রচার করছেন এবং নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চড়া মূল্যে বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট বিক্রি করছেন।

যা বলছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা

সোশাল মিডিয়ার এই প্রবণতাকে চরম বিভ্রান্তিকর ও অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন বিশ্বখ্যাত প্রজনন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুক্স মিনহাস বলেন,

“পুরুষদের বন্ধ্যাত্ব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সোশাল মিডিয়া হুজুগ তৈরি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ ও ভীতি ছড়াচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট চক্রের বাণিজ্যিক স্বার্থ সিদ্ধি করছে।”

ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রজনন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অধ্যাপক চান্না জায়াসেনা জানান, সোশাল মিডিয়ায় প্রচার হওয়া দাবিগুলো চরম অতিরঞ্জিত। চিকিৎসকদের মতে, অণ্ডকোষে অতিরিক্ত বরফ লাগানো কিংবা সাউনা বাথের মতো অতি-তাপমাত্রার সংস্পর্শে যাওয়ার মতো ঘরোয়া পদ্ধতিগুলোর কার্যকারিতার পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ (Scientific Evidence) নেই; বরং উল্টো এগুলো শরীরের স্বাভাবিক হরমোন চক্রের ক্ষতি করতে পারে।

জন্মহার হ্রাসের আসল কারণ কী?

সম্প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ইনফ্লুয়েন্সার দাবি করেছেন যে, ১৯৭০ সালের তুলনায় বর্তমান প্রজন্মের পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দাবির পেছনে কোনো অকাট্য বা দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক জীবনে উর্বরতা হ্রাসের পেছনে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, পরিবেশগত দূষণ, বডি বিল্ডিংয়ে ব্যবহৃত স্টেরয়েড এবং টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির (TRT) অতিব্যবহার আংশিক দায়ী হতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্বজুড়ে জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে প্রজনন ক্ষমতার চেয়ে অর্থনৈতিক মন্দা, ক্যারিয়ারের ব্যস্ততা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটই মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।

ইনফ্লুয়েন্সারদের অবৈজ্ঞানিক ও চটকদার প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপমুক্ত থাকা এবং নিয়মিত ব্যায়ামের মতো প্রমাণিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 8   +   5   =