আদালত প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল:
মিরপুরের চাঞ্চল্যকর শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি স্বপ্না খাতুন কনডেম সেলে বসে অনুশোচনা করছেন। মাদকাসক্ত স্বামী সোহেল রানাকে বিয়ে করার মাশুল ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিবরণ পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলে।
“জীবনসঙ্গীর পাপে আজ আমার জীবন নিষ্পেষিত। বাবা-মায়ের কথা মেনে সোহেলকে বিয়ে না করলে হয়তো এমন খেসারত দিতে হতো না। জেনেশুনে একজন মাদকাসক্তকে বিয়ে করার এমন করুণ পরিণতি ভোগ করতে হবে, তা কখনো ভাবিনি।”
মিরপুরের চাঞ্চল্যকর শিশু রামিসা (৮) ধর্ষণ ও মস্তকচ্ছেদ করে হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এবং ঢাকা শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বপ্না খাতুন কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে বসে এভাবেই নিজের চরম আক্ষেপ ও অনুশোচনা প্রকাশ করেন। একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি তার জীবনের এই করুণ চিত্র তুলে ধরেন।
কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কনডেম সেলে স্বপ্নার দিন কাটছে চরম কান্নাকাটি আর হতাশায়। প্রথম সংসারের তিন বছর বয়সী ফেলে আসা সন্তান এবং নিজের মায়ের মুখ মনে করে সারাক্ষণ চোখের জল ফেলছেন তিনি।
অভিভাবকের অমত ও মাদকাসক্তের সঙ্গে বিয়ে
স্বপ্নার বাড়ি নাটোরের সিংড়ার চৌগ্রামে। ২০১২-১৩ সালের দিকে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় রুহুল আমিন নামের এক যুবকের সঙ্গে তার প্রথম বিয়ে হয়। সেখানে ২০১৭ সালে তার একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। তবে ২০২০ সালের দিকে প্রথম স্বামী তাকে ডিভোর্স দিলে তিনি মায়ের কাছে ফিরে আসেন এবং একটি চক্ষু হাসপাতালে আয়ার কাজ নেন।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালে স্বপ্নার এক চাচা সোহেল রানাকে (বর্তমান স্বামী) তাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। স্থানীয় লোকজন সোহেলকে মাদকাসক্ত (প্রতিদিন ৫ পিস ইয়াবা সেবনকারী) হিসেবে চিহ্নিত করায় স্বপ্নার বাবা-মা এই বিয়েতে তীব্র আপত্তি জানান। কিন্তু পরিবারের অমতেই ২০২৩ সালে গোপনে সোহেলকে বিয়ে করেন স্বপ্না। বিয়ের পর তারা প্রথমে নারায়ণগঞ্জ, পরে সাভারের বাইপাইল এবং সর্বশেষ মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে সাবলেট হিসেবে থাকতে শুরু করেন। আর এই মিরপুরের ফ্ল্যাটেই ঘটে সেই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড।
রক্তাক্ত বাথরুম ও মস্তকবিহীন লাশ
মামলার নথি ও স্বপ্নার বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার দিন গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী শিশু রামিসা আক্তার ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজেদের কক্ষে নিয়ে যান। স্বপ্নার দাবি, স্বামী সোহেল তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুমিয়ে রাখতে বলেছিল।
পরবর্তীতে বাইরে থেকে দরজা ধাক্কানোর শব্দে স্বপ্নার ঘুম ভাঙলে তিনি বাথরুমে রক্ত দেখতে পান। ফ্ল্যাটের দরজার গোল লকের ফাঁকা দিয়ে দেখতে পান বাইরে উত্তেজিত জনতা দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে খাটের নিচে মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতিতে শিশুটির কাটা মাথা উদ্ধার করে।
হত্যাকাণ্ডে সহায়তা ও ফাঁসির রায়
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, প্রধান আসামি সোহেল রানা শিশু রামিসাকে বাথরুমে আটকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। এরপর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ছুরি দিয়ে মাথা কেটে আলাদা করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধবিচ্ছিন্ন করে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে।
আদালতের রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ঘটনার সময় স্বপ্না শুধু উপস্থিতই ছিলেন না, বরং উত্তেজিত জনতা যখন বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল, তখন তিনি ভেতর থেকে দরজা আটকে রেখে ঘাতক স্বামী সোহেলকে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান তদন্ত শেষে উভয়ের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। অপরাধীকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা ও পালাতে সহায়তা করায় আদালত তাকে হত্যাকাণ্ডের ‘সহযোগী’ হিসেবে সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
বর্তমানে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার সহযোগী স্ত্রী স্বপ্না খাতুন—উভয়েই কারাগারের কনডেম সেলে ফাঁসির প্রহর গুনছেন।

