চাপে খাদ্য নিরাপত্তা

দেশে মাথাপিছু খাদ্য সরবরাহ বেড়েছে, বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের প্রবেশাধিকারও উন্নত হয়েছে; তবু খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। বরং মূল্যস্ফীতি, আয়বৈষম্য, পুষ্টিহীন খাদ্যাভ্যাস এবং জলবায়ু ঝুঁকির সম্মিলিত চাপে দেশের প্রায় ২১.৯২ শতাংশ খানা মাঝারি বা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক্সিকিউটিভ সামারিতে ‘খাদ্য নিরাপত্তা পরিসংখ্যান-২০২৩’ ও ফ্যামিলি ইনকাম ও এক্সপেন্ডিচার সার্ভে প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে এমন বহুমুখী সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে ০.৮২ শতাংশ খানা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে। যদিও এই হার তুলনামূলকভাবে কম, তবে মাঝারি ও তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তা মিলিয়ে মোট হার দাঁড়িয়েছে ২১.৯২ শতাংশে, যা বাস্তব চিত্রকে অনেক বেশি উদ্বেগজনক করে তুলেছে। অর্থাৎ প্রতি পাঁচটি পরিবারের অন্তত একটি পরিবার নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত বা মানসম্মত খাদ্য পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরো খারাপ।

পল্লী এলাকায় ২৩.৮৯ শতাংশ খানা মাঝারি বা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় রয়েছে, যেখানে শহরে এই হার ২০.৫৬ শতাংশ। সিটি করপোরেশন এলাকায় তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থা দেখা গেলেও সেখানে ১৩.০৬ শতাংশ খানা এখনো খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে। তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার হার গ্রামে ০.৯১ শতাংশ, শহরে ০.৬৬ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশনে ০.৫৮ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে বৈষম্যের চিত্র আরো স্পষ্ট। রংপুর বিভাগে মাঝারি বা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার হার সর্বোচ্চ ২৯.৫৩ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের অনেক ওপরে। বিপরীতে ঢাকা বিভাগ তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে, যেখানে এই হার ১৭.০৫ শতাংশ। তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার ক্ষেত্রে সিলেট বিভাগ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে এই হার ১.৩৭ শতাংশ।

খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মাথাপিছু ক্যালরি প্রাপ্যতা। এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি দেখা গেলেও তা যথেষ্ট নয়। ২০১৬ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক খাদ্য সরবরাহ ছিল ২৪১৭.৪২ কিলোক্যালরি, যা ২০২১ সালে বেড়ে ২৫১৬.০৭ কিলোক্যালরিতে দাঁড়িয়েছে—প্রায় ৪.০৮ শতাংশ বৃদ্ধি। কিন্তু এই বৃদ্ধি সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। কারণ এই ক্যালরি সব মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না এবং এর বড় অংশই কার্বোহাইড্রেটনির্ভর।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে মাথাপিছু দৈনিক কার্বোহাইড্রেটের প্রাপ্যতা ছিল ৩৭৪.৯৩ গ্রাম, যার বেশির ভাগই এসেছে খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চাল থেকে। এর বাইরে শিকড়, কন্দ ও কলাজাতীয় খাদ্য থেকে কার্বোহাইড্রেট প্রাপ্যতা ছিল ২০.৫২ গ্রাম। অন্যদিকে প্রোটিন ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসমৃদ্ধ খাদ্যের প্রাপ্যতা তুলনামূলকভাবে কম, যা পুষ্টির ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পুষ্টির এই ঘাটতি বাস্তব জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এখনো ‘ক্যালরি নিরাপত্তা’ পর্যায়ে আটকে আছে; ‘পুষ্টি নিরাপত্তা’ নিশ্চিত হয়নি। খাদ্য নিরাপত্তার আরেকটি দিক হলো মৌলিক সেবার প্রাপ্যতা। প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৮৯.৫৪ শতাংশ পরিবার টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে, যেখানে মাত্র ৮.৩৮ শতাংশ পরিবার সরবরাহকৃত পানি পায়। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ৯৮.২৪ শতাংশ পরিবার জাতীয় গ্রিডের আওতায় এসেছে, যা ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এসব সেবার উন্নতি খাদ্য নিরাপত্তার মূল সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেনি।

খানার গড় আকার ৪.০৯ জন, যেখানে গ্রামে এটি ৪.১৩ এবং শহরে ৪.০৯। সিটি করপোরেশন এলাকায় খানার আকার কম, গড়ে ৩.৮৮ জন। বড় পরিবারে আয় সীমিত থাকলে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ে, যা গ্রামাঞ্চলের উচ্চ খাদ্য অনিরাপত্তার একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকট আরো তীব্র করছে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কৃষি উৎপাদন অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। ফলে খাদ্যের সরবরাহ ও দাম—উভয় ক্ষেত্রেই অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফলের প্রাপ্যতা ২০২১ সালে ছিল প্রায় ১১.১৫ গ্রাম এবং শাক-সবজির প্রাপ্যতা প্রায় ৬.৪৮ গ্রাম, যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কিছুটা সহায়তা দিলেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অনেক দরিদ্র পরিবার এই সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এই কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিবিএসের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরাঞ্চলের বিভাগগুলো—রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও সিলেট—খাদ্য অনিরাপত্তার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ৩৮.৩ শতাংশ পরিবার তাদের ব্যয়ের ৫০ শতাংশের কম খাদ্যে ব্যয় করে। প্রায় ৩৪.৫ শতাংশ পরিবার ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ ব্যয় করে, আর ১৭ শতাংশ পরিবার ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ ব্যয় করে। তবে ১০.২ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ বা তার বেশি খাদ্যে ব্যয় করতে বাধ্য হয়।

বিবিএস জানিয়েছে, অনেক পরিবার দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে। চরম পরিস্থিতিতে কিছু পরিবার চুরি, যৌনকর্ম বা ভিক্ষাবৃত্তির মতো পথ বেছে নিচ্ছে; যদিও এমন পরিবারের হার খুবই কম (০.৫ শতাংশ থেকে ১.১ শতাংশ)। এ ছাড়া অনেকে শিশুদের অল্প বয়সে বিয়ে দিচ্ছে, শিশুদের স্কুল থেকে তুলে নিচ্ছে বা পরিবারের সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; মানুষের আয় বৃদ্ধি, খাদ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো আরো কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে, যাতে প্রকৃত দরিদ্ররা এর সুবিধা পায়।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এম এ সাত্তার মন্ডল বলেন, ‘বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতির তুলনায় আমাদের অবস্থান খারাপ নয়, কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। আমরা মূলত চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, কিন্তু সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তায় পিছিয়ে আছি। কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই হবে না

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 3   +   7   =