সোহেল হাওলাদার: একটি চলচ্চিত্র তখনই কালজয়ী হয়ে ওঠে, যখন তার প্রতিটি চরিত্র পর্দার সীমানা পেরিয়ে দর্শকের মগজে এবং হৃদয়ে বাস্তব হয়ে ধরা দেয়। আমাদের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির সোনালী অতীতের দিকে তাকালে এই সত্যটি সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে ধরা পড়ে। নির্মাণশৈলী, গল্পভাবনা এবং চরিত্রায়নের গভীরতা—যেকোনো দিক থেকেই আমাদের অতীত সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি আজকের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং উন্নত ছিল।
সেই সময়ে রূপালি পর্দার প্রতিটি চরিত্র ফুটে উঠত তার নিজস্ব ও সহজাত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। চরিত্রের প্রয়োজনে পোশাকের ধরণ থেকে শুরু করে মেকআপ—সবকিছুতেই থাকত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত উপস্থাপনা। কোনো কৃত্রিমতা বা বাইরের সস্তা চটকদার প্রভাব চলচ্চিত্রের মূল সুর ও চরিত্রের স্বাভাবিক রূপকে কখনো নষ্ট করত না। তৎকালীন লেখক ও পরিচালকেরা সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের আসল মনস্তত্ত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত নিপুণভাবে পর্দায় তুলে আনতেন। আর ঠিক এই কারণেই সেই সব সিনেমা এবং চরিত্র যুগের পর যুগ পার হয়ে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও দর্শকপ্রিয়।
আমাদের চলচ্চিত্রের এই সোনালী অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান শক্তি ছিল এর ‘বাস্তবমুখী সাহসিকতা’। উদাহরণস্বরূপ, কিংবদন্তি নির্মাতা আমজাদ হোসেনের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’-র কথা বলা যায়। সেখানে তিনি তিন গ্রামীণ নারীকে প্রকাশ্যে ধূমপান করতে দেখিয়েছেন। এটি কোনো সস্তা বিনোদন বা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া দৃশ্য ছিল না; বরং গ্রামীণ শোষিত ও প্রান্তিক নারীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা ও চরিত্রের প্রয়োজনে অভিনেত্রীরা কোনো দ্বিধা ছাড়াই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
আবার অন্য এক চলচ্চিত্রে আমরা দেখেছি ঢাকাই সিনেমার তৎকালীন শীর্ষ জননন্দিত নায়িকা শাবানাকে স্বয়ং রিকশা চালাতে। চরিত্রের প্রয়োজনে গ্লামার বা তারকার ইমেজ ভেঙে সাধারণ মানুষের সমান্তরালে দাঁড়ানোর এই যে স্পর্ধা, তা আজ ভাবাই যায় না। এমন অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে আমাদের পুরোনো দিনের চলচ্চিত্রে।
তৎকালীন চলচ্চিত্রের লেখক, পরিচালক থেকে শুরু করে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা তাদের প্রতিটি সৃষ্টিতে যে অসাধারণ পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা বর্তমান প্রজন্মের জন্য এক বড় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
চরিত্রগুলো বাস্তবসম্মত ছিল বলেই আজ এত বছর পরও সেই সব সিনেমা নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে গভীর বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করা সম্ভব হচ্ছে। সমাজ বাস্তবতা ও শৈল্পিক সাহসিকতার সেই মেলবন্ধন যদি আজ আবার আমাদের চলচ্চিত্রে ফিরিয়ে আনা যায়, তবেই ঢাকাই সিনেমা তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

