বিনোদন প্রতিবেদক, ঢাকা: প্রতি ঈদেই সিনেমা হলে দর্শকের উপচে পড়া ভিড় আর নতুন ছবির আমেজ থাকে অন্যরকম। এবারের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মান কেমন ছিল, গল্প আর নির্মাণের মুন্সিয়ানায় কে কাকে ছাড়িয়ে গেল—তা নিয়ে দর্শকদের মাঝে চলছে তুমুল আলোচনা। ঈদের ছবিগুলোর সামগ্রিক মান, অভিনয় ও পরিচালনার ওপর ভিত্তি করে একটি ধারাবাহিক রিভিউ তুলে ধরা হলো। এটি সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, যা অনেকের মূল্যায়নের সাথে মিলে যেতে পারে আবার কারো ভিন্নমতও থাকতে পারে।
১. রইদ (মান বিচারে ১ম)
মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’ মানের দিক থেকে এবারের ঈদের প্রথম অবস্থানে রয়েছে। ছবিটির মেকিং নিঃসন্দেহে ‘মাস্টারপিস’ লেভেলে পৌঁছেছে। আদম ও হাওয়ার চিরন্তন কনসেপ্টকে ধারণ করে ‘সাদু’ ও ‘সাদুর বউ’ চরিত্রের জীবন সংগ্রাম, প্রেম ও পরিণতি পর্দায় অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রধান দুই চরিত্রে নাজিফা তুষি ও মোস্তাফিজুর নূর ইমরান তাদের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয়দক্ষতা দেখিয়েছেন। চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে ভাঙার যে ডেডিকেশন তারা দেখিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সাদু চরিত্রে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান নিজের লুক ও অভিনয়ের উচ্চতা ধরে রেখেছিলেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে সাদুর বউয়ের বৈচিত্র্যময় ভূমিকায় অনবদ্য ছিলেন নাজিফা তুষি। ছবির টপনচ সিনেমাটোগ্রাফি এবং লোকেশনের কাব্যিক সৌন্দর্য নির্মাণকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। পরিচালকের সুনির্মাণ ও শিল্পীদের নিখুঁত অভিনয়ে এটিই এবারের ঈদের সেরা ছবি।
২. বনলতা সেন (মান বিচারে ২য়)
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন ও কর্মের একটি নির্দিষ্ট রূপ শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে মাসুদ হাসান উজ্জ্বল পরিচালিত ‘বনলতা সেন’ ছবিতে। কবির বহুল চর্চিত ও বিখ্যাত কবিতা ‘বনলতা সেন’ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তার বাস্তব ও কাল্পনিক উপস্থিতির মধ্যে এক দারুণ মেলবন্ধন তৈরি করেছেন পরিচালক। এছাড়া কবির আরও বেশ কয়েকটি বিখ্যাত কবিতার থিম এখানে শৈল্পিকভাবে এসেছে। ছবির মূল চারটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন খায়রুল বাশার (জীবনানন্দ দাশ), মাসুমা রহমান নাবিলা (বনলতা সেন), রূপন্তী আকিদ (শোভনা) এবং সোহেল মণ্ডল (মহীন)। জীবনানন্দের ‘ঘোড়া’ কবিতার চরিত্র মহীনের বয়ানে ছবিটির গল্প বলা হয়েছে, যা ছিল পরিচালকের সবচেয়ে ক্রিয়েটিভ জায়গা। কারিগরি দুই-একটি ছোটখাটো ত্রুটি ছাড়া সৃজনশীল উপস্থাপনার কারণে এটি মানের দিক থেকে ঈদের দ্বিতীয় সেরা ছবি।
৩. রকস্টার (মান বিচারে ৩য়)
আজমান রুশো পরিচালিত ‘রকস্টার’ ছবিতে বর্তমান বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়ক শাকিব খান একদমই নতুন রূপে হাজির হয়েছেন। ক্যারিয়ারে এই প্রথম তিনি একজন মিউজিশিয়ানের চরিত্রে অভিনয় করলেন এবং তার এই শক্তিশালী পারফরম্যান্সই ছবির মূল চালিকাশক্তি। ছবির গল্প ভালো হলেও পরিচালকের উপস্থাপনায় কিছুটা দুর্বলতা স্পষ্ট ছিল। শাকিবের বিপরীতে সাবিলা নূর বেশ ভালো অভিনয় করেছেন, অন্যদিকে তানজিনা মিথিলা নিজের গ্ল্যামার দিয়ে দর্শকের দৃষ্টি কেড়েছেন। সার্বিক বিচারে ছবিটি রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে।
৪. মাসুদ রানা (মান বিচারে ৪র্থ)
কাজী আনোয়ার হোসেনের বিখ্যাত সেবা প্রকাশনীর বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ অবলম্বনে সৈকত নাসির নির্মাণ করেছেন ‘মাসুদ রানা’। ভালো গল্প থাকা সত্ত্বেও ছবিটিতে মিডিয়াম মানের প্রেজেন্টেশন দেখা গেছে। তবে ছবিতে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর ধারাবাহিকতা ভালো থাকায় গল্পের গতি বজায় ছিল। কারিগরি দিক থেকে কিছু দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেছে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে নবাগত রাসেল রানা যথেষ্ট পরিশ্রম করলেও অভিনয়ে পরিপক্বতার অভাব ছিল। নায়িকাদের মধ্যে পূজা চেরী অভিনয় ও পারফরম্যান্সে বেশ এগিয়ে ছিলেন, তবে অন্য নায়িকা সৈয়দা তিথি ছিলেন গড়পড়তা মানের। ঈদে মুক্তির তালিকায় এটি চতুর্থ অবস্থানে।
৫. মালিক (মান বিচারে ৫ম)
সাইফ চন্দন পরিচালিত ‘মালিক’ ছবিতে ভরপুর অ্যাকশন অবতারে হাজির হয়েছেন আরিফিন শুভ। পর্দায় তার লুক ছিল দুর্দান্ত এবং নিজের চরিত্রে তিনি একদম পারফেক্ট ছিলেন। তবে গল্প অনুযায়ী ছবির গতি বেশ ধীর ছিল, যা পরিচালকের নির্মাণ দুর্বলতাকে প্রকাশ করে। শুভর বিপরীতে নুসরাত ফারিয়া মীম ভালো পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন। ছবির গানগুলো বেশ এনার্জেটিক হলেও ধীরগতির কারণে ঈদের ছবির মধ্যে এটি পঞ্চম অবস্থানে জায়গা পেয়েছে।
৬. পিনিক (মান বিচারে ৬ষ্ঠ)
জাহিদ জুয়েল পরিচালিত ‘পিনিক’ ছবিটি মূলত শবনম বুবলীর অভিনয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে এবং তিনিই ছিলেন ছবির মূল আকর্ষণ। নায়কের চরিত্রে আদর আজাদের অ্যাকশন দৃশ্যগুলো জমজমাট হলেও, তার সাম্প্রতিক অন্যান্য ছবির সাথে লুকের মিল থাকায় অভিনয়ে নতুন কোনো বিশেষত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়া পরিচালক ছবিটিকে কিছুটা এলোমেলোভাবে উপস্থাপন করেছেন। যার কারণে এবারের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলোর মধ্যে এটি ষষ্ঠ বা সর্বশেষ অবস্থানে থাকবে।

