অমরত্বের সন্ধানে পুতিন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘায়ু ও বার্ধক্য প্রতিরোধে আগ্রহ নতুন কিছু নয়। তবে এবার বিষয়টি আরও বড় পরিসরে সামনে এসেছে। দেশটির সরকার প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, যার লক্ষ্য মানুষের আয়ু বৃদ্ধি এবং জটিল রোগে মৃত্যুহার কমানো।

 

শুক্রবার (২৯ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্রকল্পে বায়োপ্রিন্টিং ও জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বায়োপ্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে থ্রিডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবন্ত টিস্যু তৈরি করা হয়। অন্যদিকে জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনে ক্ষুদ্রাকৃতির শূকরের (মিনি পিগ) দেহে মানব অঙ্গ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে।

২০২৪ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্য ভবিষ্যতে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে গবেষকেরা বায়োপ্রিন্টেড মানব কার্টিলেজ টিস্যু এবং ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি তৈরির দাবি করেছেন। দশকের শেষ নাগাদ মানুষের জন্য প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গ তৈরি করাই তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।

এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পুতিনের মেয়ে ও এন্ডোক্রিনোলজিস্ট মারিয়া ভোরন্তসোভা। তার সঙ্গে রয়েছেন রুশ পদার্থবিজ্ঞানী মিখাইল কোভালচুক। কোভালচুকের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে বিজ্ঞান এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ মেরামত কিংবা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে।

রুশ গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘অমরত্ব নিয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা কঠিন। তবে মানুষের শরীর মেরামতের সক্ষমতা ভবিষ্যতে অনেক বাড়বে।’

গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন

তবে প্রকল্পটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। রাশিয়ায় বায়োপ্রিন্টিং গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার অস্ত্রোভস্কি দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার-রিভিউড গবেষণা জার্নালে প্রকল্পটির দাবিগুলোর পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায় না।

বর্তমানে রাশিয়ার বাইরে অবস্থানরত এই বিজ্ঞানীর মতে, প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কিছু গবেষক হয়তো সরকারি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তার ভাষায়, এসব বক্তব্য এখনো মূলত ‘আকাঙ্ক্ষা’ হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।

দীর্ঘায়ু নিয়ে পুতিনের আগ্রহ

৭৩ বছর বয়সী পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু নিয়ে আগ্রহী বলে পরিচিত। ঘোড়ায় চড়া, আইস হকি খেলা এবং নিয়মিত শরীরচর্চার নানা ছবি প্রায়ই প্রকাশ্যে এসেছে। করোনাভাইরাস মহামারির সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহীদের জন্য কঠোর স্বাস্থ্যবিধি ও দীর্ঘ কোয়ারেন্টিনও বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিনের আগ্রহের একটি ক্ষেত্র হলো ক্রায়োথেরাপি। এতে শরীরকে অতি নিম্ন তাপমাত্রার পরিবেশে স্বল্প সময়ের জন্য রাখা হয়। ২০১৮ সালে অস্ট্রিয়ার তৎকালীন চ্যান্সেলর সেবাস্টিয়ান কুর্জের সঙ্গে আলোচনায় তিনি এই পদ্ধতির সম্ভাব্য উপকারিতার কথাও উল্লেখ করেছিলেন।

সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় পুতিনকে মানব অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দীর্ঘায়ু বা প্রায় অমরত্বের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে শোনা গেছে।

উচ্চাকাঙ্ক্ষা নাকি প্রয়োজন?

বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘায়ু গবেষণায় পুতিনের আগ্রহের পেছনে ব্যক্তিগত ও জাতীয় দুই ধরনের কারণই থাকতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপে পুরুষদের গড় আয়ু যথাক্রমে প্রায় ৭৬ ও ৮০ বছর হলেও রাশিয়ায় তা প্রায় ৬৮ বছর। ফলে দেশটির জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নত করাও এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, প্রকল্পটি কতটা বাস্তবসম্মত এবং এর ঘোষিত লক্ষ্যগুলো কতটা অর্জনযোগ্য সেটিই এখন দেখার বিষয়

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 9   +   4   =