মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে ঈদুল আজহা এক পবিত্র উৎসব। ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এক মহৎ ইবাদত। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ বিশেষ দিনে পশু কোরবানি করা হয়। আর এ উৎসব কেন্দ্র করেই প্রতি বছর দেশে এক বিশাল বাজার অর্থনীতি গড়ে ওঠে। চলতি বছরও এর কোনো ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এবার কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৭ হাজার। এর বিপরীতে দেশে পশুর জোগান রয়েছে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে চাহিদার তুলনায় জোগানে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু আসল সমস্যাটি লুকিয়ে রয়েছে অন্য জায়গায়। আমাদের দেশে কোরবানির পশুর সামগ্রিক মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আজও কোনো সুনির্দিষ্ট বা স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। আর এ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই তৈরি হচ্ছে এক মস্ত বড় বিপদ।
কিছু খামারির অতিমুনাফা লাভের লোভ আজ এ বিপদ ডেকে আনছে। তারা সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপায়ে, নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক খাইয়ে রাতারাতি গরু মোটাতাজা করছেন। প্রাকৃতিকভাবে সাধারণ ঘাস-খড় খাওয়া সুস্থ গরু আর কৃত্রিম খাবারে পুষ্ট কৃত্রিম গরুর তফাত বোঝা সাধারণ ক্রেতার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। তার ওপর হাটে বিক্রি হওয়া গরুর কোনো ‘ওয়ারেন্টি’ বা আইনি গ্যারান্টি থাকে না। ফলে রোগাক্রান্ত কিংবা ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত গরু চেনার জন্য পশুর হাটে কোনো তাৎক্ষণিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার সুযোগও মিলছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেই ১৯৮৮ সালেই গবাদি পশুতে সব ধরনের স্টেরয়েডের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। এখানে পশুর ‘গ্রোথ হরমোন’ হিসেবে স্টেরয়েড ব্যবহারের ক্ষেত্রে বহু খামারি একেবারেই অসচেতন ও বেপরোয়া। এ রাসায়নিকের অতিরিক্ত প্রয়োগের ফলে অনেক সময় পশুর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে। শুধু তাই নয়, অতিদ্রুত ওজনে ভারী করতে অনেকে গরুকে অতিরিক্ত ইউরিয়া খাওয়াচ্ছেন। ইউরোপে ইউরিয়াকে বিপজ্জনক খাদ্য হিসেবে গণ্য করা হয়। অথচ আমাদের মতো দেশে একে সস্তার সম্পদ ভাবা হচ্ছে। এটা ঠিক যে, ইউরিয়া নাইট্রোজেনের এক শক্তিশালী উৎস। কিন্তু অতিরিক্ত নাইট্রোজেন পশু এবং মানুষ— উভয়ের শরীরের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর।
স্টেরয়েডের সরাসরি প্রভাবে গরুর পরিপাকতন্ত্র অতিরিক্ত সক্রিয় বা হাইপার অ্যাকটিভ হয়ে ওঠে। এর ফলে পশুর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষুধা ও তৃষ্ণা পায়। গরু তখন প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্তমাত্রায় খাবার খেতে শুরু করে। এ অতিরিক্ত খাদ্যের চাপে তার পরিপাকতন্ত্রের ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি হয়। একসময়ে পরিপাকতন্ত্র সেই খাবার হজম করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। তখন এই অতিরিক্ত সঞ্চিত খাবার গরুর কিডনিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। শরীর থেকে স্বাভাবিক নিয়মে জল ও মূত্র নিষ্কাশিত হতে পারে না। ফলে গরুর শরীর ফুলেফেঁপে ওঠে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় গরু বুঝি বেশ স্বাস্থ্যবান।
কোরবানির ঈদের ঠিক তিন থেকে ছয় মাস আগে বিভিন্ন খামারে এ বিপজ্জনক খেলা শুরু হয়। এতে একদিকে যেমন অবোলা পশুর ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হচ্ছে, অন্যদিকে ক্রেতারাও সেই অসুস্থ পশু কিনে ঠকছেন। পবিত্র ধর্মীয় আবেগের আড়ালে নির্বিচারে চলছে এক নিষ্ঠুর প্রতারণার ব্যবসা।
এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কিছু বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার শতভাগ প্রয়োগ বা অনুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বাজারে গবাদি পশুর যেসব প্রতিষেধক বা ওষুধ পাওয়া যায়, সেগুলো আদৌ মেয়াদি কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সেগুলো সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষিত হচ্ছে কি না, তা-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। খামারিদের বোঝাতে হবে কোনটা অপরাধ আর কোনটা অপরাধ নয়। এর জন্য তাদের যেমন নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার, তেমনই আইনের কঠোর প্রয়োগও অপরিহার্য।
একদিকে যেমন অবোলা পশুর ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হচ্ছে, অন্যদিকে ক্রেতারাও সেই অসুস্থ পশু কিনে ঠকছেন। পবিত্র ধর্মীয় আবেগের আড়ালে নির্বিচারে চলছে এক নিষ্ঠুর প্রতারণার ব্যবসা
পশুদেহে এ বিষক্রিয়ার প্রভাব কিন্তু সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। ফুড চেইনের বা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এ বিষাক্ত মাংস শেষ পর্যন্ত মানুষের পাতেই পৌঁছায়। আর তা খেয়ে মানুষের লিভার, কিডনি, হার্টসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এমনকি অন্তঃসত্ত্বাদের শরীরে হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মানবস্বাস্থ্যের ভবিষ্যতের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর কী হতে পারে?
এ অপরাধের চক্র ভাঙতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পৌর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় দেশ জুড়ে ব্যাপক মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো দরকার। এর আগে ভেজালবিরোধী আন্দোলন এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে মোবাইল কোর্ট অনন্য সাফল্য দেখিয়েছিলেন। আমাদের দেশে ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’-এর তফসিলে ‘মৎস্য খাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১৫’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং আইনি অস্ত্রের কোনো অভাব নেই।
এই আইনের ১২(১)(ক) ধারা অনুযায়ী, পশুখাদ্যে যদি মানুষ বা পশুর জন্য ক্ষতিকর কোনো পদার্থ থাকে, তবে তা দণ্ডনীয় অপরাধ। আবার একই আইনের ১২(১)(খ) ধারা বলছে, খাদ্যমান যদি আদর্শ মানের চেয়ে কম বা অসংগতিপূর্ণ হয়, তবে তাও অপরাধ। এ ছাড়া ১৪(১) ধারায় পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড, কীটনাশকসহ সব ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অতএব, এ অপরাধের বিচার মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেই সম্ভব। পশুর শরীরে বিষাক্ত ওষুধ প্রমাণিত হলে তাৎক্ষণিক জেল ও জরিমানার বিধান করতে হবে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮)-এর ৫১৬-এ থেকে ৫২৫ ধারার আলোকেই এ ধরনের অসুস্থ পশু বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
কোরবানির পশুর হাটে যেসব গরু আসবে, সেগুলোর রক্ত পরীক্ষা করা দরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দিয়ে ‘র্যান্ডম স্যাম্পলিং’ বা লটারি ভিত্তিতে এ পরীক্ষা করতে হবে। হাটের অন্তত কিছু গরুর রক্ত পরীক্ষা না করলে এ আইনের কোনো সার্থকতা থাকবে না। সাধারণ মানুষকেও সচেতন করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে, কোরবানির সার্থকতা শুধু বিশালাকার বা মোটাতাজা গরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় বিধান হলো একটি নিখুঁত, সুস্থ ও স্বাভাবিক পশু কোরবানি দেওয়া। এখানে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি কোনোভাবেই অবহেলা করা চলবে না।
লোভী ব্যবসায়ীদের মনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অতিমুনাফার লোভে যে পশুদের বিষ খাইয়ে বড় করা হয়েছে, সেগুলো ধরে ধরে ধ্বংস করতে হবে। তা দেখলেই ভবিষ্যতে অন্যরা এ অপরাধ করতে ভয় পাবে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের কথা বলা যায়। ১৯৮৮ সালে সেখানে যখন ‘ম্যাড কাউ’ রোগ দেখা দিয়েছিল, তখন সরকার বিপুলসংখ্যক গরু মেরে ধ্বংস করেছিল। সেসব রোগাক্রান্ত গরু বাজারে বিক্রি করার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। তবে শুধু সাজা দিলেই হবে না। মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে যে বিচার হবে, তা যেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বিতর্কহীন হয়। তার জন্য প্রয়োজন তথ্যপ্রমাণভিত্তিক বিচার। আর এ কাজের জন্য প্রয়োজন আধুনিক বিজ্ঞান, উন্নত প্রযুক্তি এবং কারিগরি জ্ঞানের সঠিক সমন্বয়।

