রায়হান রহমান (ছদ্মনাম) পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। রাজধানীর বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা। এক সকালে অফিস যাওয়ার পথে তিনি দেখতে পান—রাস্তায় একটা কুকুর একটা বিড়ালকে ধাওয়া করেছে। রায়হান দ্রুত কুকুরকে সরিয়ে দিয়ে বিড়ালটাকে উদ্ধার করেন। কুকুরটা চলে যাওয়ার পর তিনি বিড়ালটাকে ছেড়ে দেন। বিড়ালটা একটা টং দোকানের নিচে গিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু রায়হান বুঝতে পারেননি যে, বিড়ালটা আতঙ্কে তাকেই কামড় ও আঁচড়ে দিয়েছে। দুই সপ্তাহ পর ঐ পথে অফিস যাওয়ার সময় ঐ টং দোকানিকে বিড়ালটির কথা জিজ্ঞাসা করেন। তখন দোকানি জানান, বিড়ালটি কুকুরে তাড়ানোর দুই দিন পরই মারা গেছে। বিড়ালের মৃত্যুর কথা শুনে রায়হানের খারাপ লাগে। কারণ তিনি ছিলেন একজন প্রাণিপ্রেমী, উদ্ধারকর্মী। সপ্তাহখানেক পর গোসলের জন্য শাওয়ারের নিচে গেলে বুঝতে পারেন—তিনি কোনোভাবেই পানি সহ্য করতে পারছেন না। ঐ দিন উনি আতঙ্কে অফিসে না গিয়ে বাসায় থাকেন। পরের দিন তিনি বুঝতে পারেন, আর পানির কাছে যেতে পারছেন না। সেদিন সকালে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করলে জানা যায়, তিনি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর কয়েক দিন পরেই তিনি মারা যান।
শুধু রায়হান নন, মহাখালী সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে—২০২৩ সাল থেকে চলতি বছর এপ্রিল মাস পর্যন্ত এই সোয়া তিন বছর সময়ের মধ্যে জলাতঙ্ক রোগে মৃত্যু হয়েছে ১৭৫ জনের। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন, ২০২৫ সালে ৫৯ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে ১৬ জন রোগী মারা গেছেন।
এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে—২০১৫ সালে দেশে জলাতঙ্কে ৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর ২০১৬ সালে ৬৬ জন, ২০১৭ সালে ৮০ জন, ২০১৮ সালে ৫৭ জন, ২০১৯ সালে ৫৭ জন, ২০২০ সালে ২৬ জন, ২০২১ সালে ৪০ জন এবং ২০২২ সালে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়।
রাজধানীর সংক্রমক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিত্সক ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের এই হাসপাতালে বিড়াল-কুকুরের কামড় নিয়ে টিকা নিতে আসে ৫০০ থেকে ৭০০ জন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব বেড়েছে। এছাড়া, এখন অনেক পরিবার বাসায় কুকুর-বিড়াল পোষে। ফলে অনেকে কামড় কিংবা আঁচড়ের শিকার হয়। তিনি বলেন, বিড়াল, কুকুর, বেজি ও শেয়ালের কামড় থেকে জলাতঙ্ক ছড়ায়। সচেতনতার অভাবে অনেকে সামান্য ‘আঁচড় বা কামড়’ মনে করে প্রতিষেধক নিতে আসেন না। ফলে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান অনেকে। অথচ সময়মতো প্রতিষেধক টিকা নিলে সহজে প্রাণঘাতী এই রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব। তিনি বলেন, গত বছর টিকার কিছুটা ঘাটতি ছিল। এ বছর ২০২৬ সালে টিকার কোনো ঘাটতি নেই।
পরিসংখ্যান নেই :দেশে কী পরিমাণ বেওয়ারিশ কুকুর রয়েছে, তার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০২২ সাল থেকেই বন্ধ রয়েছে বেওয়ারিশ কুকুরের টিকা এবং তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। এ ছাড়া দেশে এখন কুকুর-বিড়াল পালনের ক্ষেত্রে নেই কোনো নীতিমালা। ফলে ঘরে-বাইরে সবখানেই রয়েছে প্রাণঘাতী জলাতঙ্কের ঝুঁকি। ফলে নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে এই রোগ। সম্প্রতি গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কুকুরের কামড়ে পাঁচ জনের মৃত্যু দেশ জুড়ে তৈরি করেছে আলোচনা ও জলাতঙ্গের আতঙ্ক।
জলাতঙ্ক কী :বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জলাতঙ্ক টিকা-প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। এটি প্রাণী থেকে প্রাণীতে সংক্রমিত হয়। এটি সাধারণত লালার মাধ্যমে কামড় বা আঁচড়ের দ্বারা মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে ছড়ায়। একবার রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে রোগীকে আর বাঁচানো যায় না। এই রোগ শতভাগ প্রাণঘাতী। জলাতঙ্কের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—জ্বর, ব্যথা এবং ক্ষতস্থানে অস্বাভাবিক বা ব্যাখ্যাতীত খোঁচা বা জ্বালাপোড়ার মতো সাধারণ লক্ষণ। ভাইরাসটি মস্তিষ্ক পর্যন্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডে প্রদাহ তৈরি করে।
বিশ্ব প্রতি বছর ১৫০টিরও বেশি দেশে জলাতঙ্কের কারণে বছরে আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। যার ৯৫ শতাংশই আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশলোতে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জলাতঙ্কপ্রবণ ৯টি দেশ হচ্ছে—বাংলাদেশ, ভুটান, উত্তর কোরিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—মানুষের জলাতঙ্ক প্রতিরোধের জন্য কার্যকর টিকা এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন রয়েছে। ২০১০ সাল থেকে দেশে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়া কার্যক্রম শুরু হয়। সেটি ২০২২ সালের পর থেকে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ২০১২ সালে উচ্চ আদালত কুকুর নিধনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন কোষ শাখার তথ্য থেকে জানা যায়—ইতিমধ্যে তিন বছর মেয়াদি একটি পাইলট প্রকল্প পাশ হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়া এবং পুরুষ কুকুরদের জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হবে। তবে প্রকল্প পাশ হলেও এখনো পিডি নিয়োগ হয়নি। পিডি নিয়োগ হলেই হয়তো জুলাই থেকে এই কার্যক্রম শুরু হবে। রাজধানী জুড়ে চলবে এই প্রকল্প। এরপর সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে বলে জানা যায়।
বিভিন্ন দেশে পোষাপ্রাণী পালনের নিয়ম: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ, বেওয়ারিশ প্রাণীর সংখ্যা কমানো এবং দায়িত্বশীল পোষাপ্রাণী পালন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশে চালু রয়েছে লাইসেন্স, নিবন্ধন ও বার্ষিক ট্যাক্স ব্যবস্থা। কোথাও এর নাম ‘পেট ট্যাক্স’, কোথাও ‘ডগ লাইসেন্স’, আবার কোথাও ‘পেট রেজিস্ট্রেশন ফি’। কিন্তু আমাদের দেশে প্রাণী পোষার জন্য এ ধরনের নেই কোনো নীতিমালা।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানান, বর্তমানে প্রতিদিন প্রচুর মানুষ টিকা নিতে আসেন। এমন অনেকেই আছেন, যারা বারবার আক্রান্ত হন এবং বারবার টিকা নিতে আসেন। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিড়াল দ্বারা আক্রান্ত। বাকিরা কুকুরের দ্বারা। তিনি বলেন, জলাতঙ্ক প্রাণঘাতী। এতে মৃত্যু অনিবার্য। সেজন্য সবচেয়ে ভালো হলো—মানুষ যাতে আক্রান্ত না হয়, সেই দিকে নজর দেওয়া। কুকুর-বিড়ালে কামড় বা আঁচড় দিলে যত দ্রুত সম্ভব টিকা দেওয়া উচিত। এফ এ আসমা খান আরো বলেন, যদি কামড়ের পর ছিলে-ফেটে-কেটে যায়, রক্ত বের হয় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে খারজাতীয় সাবান দিয়ে চলমান পানিতে আধাঘণ্টা ধরে ঘষে ঘষে স্থানটি ধুয়ে ফেলতে হবে। ধুয়ে সেখানে কোনো সেলাই দেওয়া যাবে না। দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে টিকা দিতে হবে।

