রাজনীতি

কেন ইউনূসকে এখনও ভুলতে পারছেন না শেখ হাসিনা? | রাজনীতি বিশ্লেষণ | দৈনিক পূর্বাচল

বিশেষ বিশ্লেষণ:দৈনিক পূর্বাচল

শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২৬ মাস পেরিয়ে গেছে। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নিয়েছে আট মাস আগে। বয়স ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অনুপস্থিতির কারণে ড. ইউনূসের ভবিষ্যতে পুনরায় ক্ষমতায় আসার বা সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সমীকরণের বিচারে তিনি শেখ হাসিনার সরাসরি কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ নন। তা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা ও তাঁর সমর্থকদের কাছে কেন এখনও অধ্যাপক ইউনূসই প্রধান ক্ষোভ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষোভের মূল কারণ কোনো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলীতে জাতিসংঘের মাধ্যমে করানো এক আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রতিবেদন। যা আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার ভাবমূর্তিতে এমন এক আন্তর্জাতিক সিল মেরে দিয়েছে, যা মোছা প্রায় অসম্ভব।

আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষতার শক্তি

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেকোনো সরকার, পুলিশ বা স্থানীয় বিচার বিভাগীয় তদন্ত রিপোর্টকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’, ‘প্রতিহিংসামূলক’ বা ‘মিথ্যা’ বলে সহজেই উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন (OHCHR) কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতিষ্ঠান নয়। ইউনূস সরকার জুলাইয়ের প্রাণহানির ঘটনার তদন্তের ভার জাতিসংঘের হাতে তুলে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়—চব্বিশের জুলাইয়ে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলিটারির ব্যবহারের উপযোগী অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে এবং এতে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠিত হয়েছে, যার প্রাথমিক দায় শেখ হাসিনা ও তাঁর তৎকালীন সরকারের ওপর বর্তায়।

এই একটি মাত্র প্রতিবেদনের কারণেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো রাষ্ট্রই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের পক্ষে প্রকাশ্যে দাঁড়াতে পারেনি। যদিও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) কিংবা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মৃত্যুদণ্ডের নীতিগত বিরোধিতা করেছে বা বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, কিন্তু শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর বিষয়টিকে তারাও সমর্থন জানিয়েছে। ভারতসহ বিশ্বের প্রভাবশালী কোনো দেশই এ নিয়ে সরাসরি অন্তর্বর্তীকাল বা পরবর্তী কাঠামোর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়নি।

গাজা ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ: নৈতিক মূল্যের তুলনা

জাতিসংঘকে বিশ্বরাজনীতিতে অনেক সময় নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দুর্বল ভাবা হলেও, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের ‘নৈতিক ওজন’ অপরিসীম।

উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন যখন গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে রিপোর্ট প্রকাশ করে এবং নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ উঠে আসে, তখন ইসরায়েল বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিকভাবে একা হয়ে পড়ে। এমনকি ইউরোপের একাধিক দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিতে শুরু করে।

ইসরায়েল ও আমেরিকার মতো পরাশক্তি যেখানে জাতিসংঘের প্রতিবেদনের রাজনৈতিক ধাক্কা এড়াতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে আন্তর্জাতিক সমর্থনের বাইরে থাকা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে জাতিসংঘের এমন একটি তদন্ত প্রতিবেদন উপেক্ষা করে পুনরায় নিজেদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথ কোন দিকে?

দলগতভাবে জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদন সংশোধনের চেষ্টা বা চিঠি চালাচালি করা হলেও তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, আন্তর্জাতিক এই রিপোর্টের কারণেই শেখ হাসিনা বা তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ইউনূস-ভীতি ও ক্ষোভ কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক মহল এবং দেশীয় রাজনীতিতে এই চাপ বা তকমা কাটিয়ে ওঠার একমাত্র পথ হতে পারে ঘটিত অপরাধের সুষ্ঠু স্বীকারোক্তি, আত্মউপলব্ধি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার চেষ্টা করা। তা না হলে আন্তর্জাতিক নথিতে রয়ে যাওয়া এই অধ্যায় বহুকাল দলটিকে রাজনৈতিক চাপে রাখবে

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment