অন্যান্য

চার্জিং পয়েন্ট-গ্যারেজে অভিযানেও ফল শূন্য

ব্যস্ত ঢাকার সড়কগুলোয় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অটোরিকশা। গলিপথ ছেড়ে বর্তমানে রাজধানীর প্রধান সড়কে হাওয়ার বেগে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত এসব তিন চাকার বাহন। এতে একদিকে যেমন সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, অন্যদিকে ঝুঁকি বাড়ছে দুর্ঘটনার। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোয় যতই উদ্যোগ নেওয়া হোক না কেন, বারবার ভেঙে পড়ছে লাগামহীন অটোরিকশার দৌরাত্ম্যে। দ্রুতগতিতে মোড় নেওয়া, হঠাৎ ব্রেক এবং আইনের তোয়াক্কা না করায় নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে সড়কে। সিগন্যাল অমান্যের পাশাপাশি হরহামেশা উল্টোপথে চলাচলের কারণে ভেঙে চুরমার হচ্ছে সড়কের শৃঙ্খলা। জব্দ কিংবা জরিমানা করেও এসব যান ও চালকদের বাগে আনতে পারছে না ট্রাফিক পুলিশ।

ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা আটক করলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য নেই পর্যাপ্ত ডাম্পিং ইয়ার্ড। সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় নির্দিষ্ট সময় পর ছেড়ে দিতে হয় বাহনগুলো। এতে স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ফলাফল তৈরি করতে পারে না আটক অভিযান। এ ছাড়া অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজগুলোয় পুলিশি অভিযান চললেও সাফল্য বলতে গেলে শূন্য।

‘তবে মূল সড়কগুলোয় রিকশা চলাচল অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রিত। পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণেই ৮৫-৯০ শতাংশ অটোরিকশা মূল সড়কে ঢুকতে পারছে না’— দাবি করলেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রধান সড়কেই নয়, দীর্ঘমেয়াদে শাখা সড়কেও অটোরিকশা চলা উচিত নয়, কারণ তাদের অনিয়ন্ত্রিত গতি বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। কিন্তু এখনই উদ্যোগ না নিলে আগামীতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বড় বাসভিত্তিক পরিবহন, আধুনিক ট্রানজিট ব্যবস্থা এবং ছোট যানবাহন ব্যবস্থাপনায় সুস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এ লক্ষ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা, জনসচেতনতা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানাল, গত তিন মাসে অন্তত দেড় লাখ অবৈধ অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ডাম্পিং করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪০৪টি বাহন। সে অনুযায়ী গড়ে প্রতি মাসে ১১ হাজার থেকে সাড়ে ১১ হাজার ডাম্পিং করা হচ্ছে। গত জুলাই মাসেই ডাম্পিংয়ে নেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৪৫৭টি অটোরিকশা। জুনে ১১ হাজার ২৭১ এবং মে মাসে ৭ হাজার ৬৭৬টি। চলতি বছরের গত মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ব্যাটারি জব্দ করা হয়েছে ২ হাজার ৯১৭টি।

কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর এলাকায় ব্যাটারিচালিত ও অটোরিকশার লাগাম টানতে বড় ধরনের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি। সম্প্রতি ডিএমপির হেডকোয়ার্টার্স থেকে বিভাগীয় উপপুলিশ কমিশনারদের (ডিসি) পাঠানো এক জরুরি চিঠিতে দেওয়া হয় এ নির্দেশনা। এতে অটোরিকশার মালিক, চালক, গ্যারেজ এবং এ জাতীয় যানবাহন তৈরির কারখানার সব বিবরণ সংগ্রহ করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কয়েক দিন সরেজমিনে রাজধানীর পল্টন, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, দোলাইরপাড়, দয়াগঞ্জ, জুরাইন, পোস্তগোলা, মগবাজার, মৌচাক, মালিবাগ, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, নিউ মার্কেট, রামপুরা ও শান্তিনগর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোনো ধরনের নিয়মনীতি না মেনেই সড়কে চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো। ফ্লাইওভারেও চোখে পড়ল এসব যানের দৌরাত্ম্য। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ফ্লাইওভারে অটোরিকশা চলাচলে প্রতিযোগিতায় নামতে দেখা যায়। মৌচাক ফ্লাইওভারেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে সকাল ও বিকালে শত শত ব্যাটারিচালিত রিকশা যাত্রী নিয়ে ফ্লাইওভার অতিক্রম করছে। এ কারণে ফ্লাইওভারে যান চলাচলের গতি যেমন কমছে, তেমনি তীব্র যানজটেরও সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া বঙ্গভবনের সামনের রাস্তায় সবসময়ই উল্টোপথে অটোরিকশা রাজউক ভবন ও মতিঝিলের দিকে যেতে দেখা গেছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেছেন, অটোরিকশার ব্রেকিং সিস্টেম ও কাঠামো দুর্বল, তাই এটি বিপজ্জনক। এই বাহনের স্ট্যাবিলিটি তার সেন্টার অব গ্রাভিটির ওপর নির্ভর করে; কিন্তু প্যাডেলচালিত রিকশায় ব্যাটারি যোগ করলে তার গ্রাভিটি বদলে যায়, ফলে দ্রুতগতিতে বাঁক নিলে অটোরিকশা উল্টে যেতে পারে।

‘অটোরিকশা চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করা সহজ নয়, কারণ এই বাহনের সঙ্গে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। তবে আপাতত মূল সড়কে এগুলো বন্ধ করা উচিত’— পরামর্শ দিলেন তিনি।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে তিনি জানিয়েছেন, এর অ্যাঙ্গেল বা চেসিস, মোটর, ব্যাটারি আমদানি করতে হয়। তাই আমদানির ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তারপর হাত দিতে হবে ওয়ার্কশপগুলোয়। এরপর বিদ্যুতের যে অপচয়, যে চুরি হচ্ছে— সেগুলোয় অভিযান করলে নতুন করে আর তৈরি হবে না।

কয়েক দিন ধরে অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজগুলোয় পুলিশি অভিযান চললেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অভিযানে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বললেন, অভিযানের ফল বলতে গেলে শূন্য। কারণ, আজ অভিযান চালালে গ্যারেজগুলো বড়জোর দু-তিন দিন বন্ধ থাকে, এরপর আবারও ফিরে যায় পুরনো রূপে। নিয়ম অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের এলাকায় যেকোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক; কিন্তু এই গ্যারেজগুলোর অধিকাংশেরই কোনো েনই বৈধতা। ডিপিডিসির লাইসেন্সবিহীন বিদ্যুৎ-সংযোগে চলছে রমরমা কারবার, যা একা পুলিশের পক্ষে সামলানো প্রায় অসম্ভব।

জানা গেছে, ডিএমপিতে কাগজ-কলমে ট্রাফিক পুলিশ আছে প্রায় ৪ হাজার ১০০ জন। ঢাকা শহরে ট্রাফিক পুলিশের প্রায় ৬২১টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করেন তারা। ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৫০ লাখ যানবাহন চলাচল করে। বিপরীতে ৬২১টি পয়েন্টে ডিউটি দেওয়ার জন্য এক শিফটে কর্মরত থাকেন মাত্র ১ হাজার ২০০ কর্মী। এর অর্থ হলো— প্রতি শিফটে প্রতিটি ডিউটি পয়েন্টে গড়ে মাত্র দুজন কর্মী পাওয়া যায়। আরও ভয়াবহ চিত্র হলো, ১ হাজার ২০০ কর্মী দিয়ে যদি ২৫ লাখ যানবাহন নিয়ন্ত্রণের হিসাব করা হয়, তবে প্রতি একজন ট্রাফিক কর্মীকে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৮৩টি যানবাহন সামলাতে হয়। আর ৫০ লাখ যানবাহনের ক্ষেত্রে এই অনুপাত দাঁড়ায় ১:৪,১৬৬। অর্থাৎ একজন কর্মীর পক্ষে ৪ হাজারের বেশি যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো জরুরি।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমানের দাবি, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক অবৈধ বা আইন অমান্যকারী যানবাহন আটক করলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত নিজস্ব ডাম্পিং ইয়ার্ড নেই। ফলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রেখে কোনোটা ১৫ দিন, কোনোটা ২০ দিন, কোনোটা এক মাস— তারপর ছেড়ে দিতে হয়।

 

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment