স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সম্পূর্ণ ডিজিটাল অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড অটোমেশন চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে কর ও শুল্ক নির্ধারণ, রিটার্ন জমা এবং পেমেন্ট প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ কাগজবিহীন ও স্বচ্ছ হবে। আগামী তিন বছরে দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং, ব্যবসা, শিল্প, রপ্তানি ও মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালকে সামনে রেখে তৈরি ‘ন্যাশনাল রোডম্যাপ ফর স্মুথ, সাসটেইনেবল অ্যান্ড ইরিভার্সিবল এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন (২০২৬-২৯)’ শীর্ষক জাতীয় রোডম্যাপে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণে প্রাপ্ত বাড়তি সময়কে পেছানোর সুযোগ হিসেবে না দেখে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি মোক্ষম সময় হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।
রোডম্যাপের পাঁচটি স্তম্ভ হলো— সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আর্থিক সক্ষমতা, বাণিজ্য ও বাজারসুবিধা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা, উৎপাদন সক্ষমতা ও শিল্প রূপান্তর, মানবসম্পদ ও ভবিষ্যৎ দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুশাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
সামষ্টিক অর্থনীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও সরকারি ঋণের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুদ্রা ও রাজস্বনীতির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন কাঠামো, নিয়মিত স্ট্রেস টেস্ট, ব্যাংকভিত্তিক সম্পদমান পর্যালোচনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা বাড়িয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, এলডিসি উত্তরণের বাড়তি সময় বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হলেও শুধু পরিকল্পনা নিলে হবে না, বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেখাতে হবে। আর্থিক খাত, রাজস্বব্যবস্থা ও অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।
ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে অনুমোদনপ্রক্রিয়ায়। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, ডিজিটাল লাইসেন্সিং এবং ‘ডিজিটাল কমন অ্যাপ্লিকেশন প্ল্যাটফর্ম’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় লাইসেন্স ও বিভিন্ন অনুমোদন মাত্র সাত দিনের মধ্যে প্রদান, অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স বাতিল এবং এগুলোর মেয়াদ পাঁচ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি কাস্টমস, বন্দর ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনা হবে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডোর আওতায়।
অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইনামুল হক খান (বাবলু) বললেন, কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ব্যবসার পরিবেশ, অর্থায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও দিতে হবে গুরুত্ব।
এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কসুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাট ও হালকা প্রকৌশল খাতকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তা ছাড়া এফটিএ, পিটিএ ও সিইপিএসহ বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে বাজারসুবিধা ধরে রাখার পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে লজিস্টিক ব্যয় ১৫ থেকে ১০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কারেও বড় পরিকল্পনা রয়েছে। জুন ২০২৮ সালের মধ্যে এনবিআরের কর ব্যবস্থায় অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড অটোমেশন চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
করজাল সম্প্রসারণ, ব্যাংক ও সিডিবিএলের তথ্যের সমন্বয়, ভ্যাট পরিপালন বৃদ্ধি এবং কর অব্যাহতির যৌক্তিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিল্প আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি শুধু সরকারের একার কাজ নয়। উৎপাদন খাতের সক্ষমতা ও কমপ্লায়েন্স বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি খাতকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
রোডম্যাপে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএসহ ব্যবসায়ী সংগঠনের জন্যও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে একটি ‘গভর্নমেন্ট-প্রাইভেট সেক্টর কম্পিটিটিভনেস অ্যাকর্ড’ স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় এলডিসি মনিটরিং অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন কমিটি ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে তদারকি করবে সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি।


