অসুস্থ স্বজনকে হাসপাতালে নিতে কিংবা আপনজন কেউ মারা গেলে দরকার হয়ে পড়ে অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়ির। চরম বিপদে দিশাহারা পরিবারের সদস্যরা যখন একটি অ্যাম্বুলেন্স খুঁজতে ব্যস্ত থাকেন, তখন চালকরা ফন্দি আঁটেন— কীভাবে জিম্মি করে বেশি ভাড়া আদায় করা যায়। শেষ পর্যন্ত বেশি ভাড়ায় যদিওবা অ্যাম্বুলেন্স মেলে কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার দশা থাকে বেহাল। মাইক্রোবাস কেটে বানানো সেসব বাহনে মিলেনি ন্যূনতম সেবা। অবশ্য অ্যাম্বুলেন্সসেবায় এসব নৈরাজ্যের দিন এবার ফুরাতে যাচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সসেবা আসছে নীতিমালার আওতায়।
‘অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান সার্ভিস নীতিমালা-২০২৫’ নামের নীতিমালার খসড়া করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে নেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামতও। এটি বাস্তবায়ন হলে ভাড়াসহ নানা দিক থেকে স্বস্তি পাবেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেছেন, ‘একসময় হাসপাতালগুলোতে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকত। কিন্তু বরাদ্দ-সংকট, চালকের অভাব, জ্বালানিসহ নানা কারণে সেই সেবা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। হাসপাতালের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে অনেক অ্যাম্বুলেন্স। ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সসেবাও সীমিত। ফলে সেবাটি পুরোপুরি বেসরকারি খাতে চলে গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালকরা জিম্মি করে ফেলেন বিপদগ্রস্তদের।’
সফিকুজ্জামানের কথার প্রতিফল পাওয়া গেল রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ার শামীম সরণির বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল ওয়াদুদ শফিকের বক্তব্যে। তিনি আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘আমার চাচাকে একবার শ্যামলীর পঙ্গু হাসপাতাল থেকে নরসিংদীর গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে গিয়ে ব্যাপক হয়রানির শিকার হয়েছিলাম। ৪ হাজার টাকার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছিল। একেকজন একেক ভাড়া চাচ্ছিলেন। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর পরিচিত একজনের সহায়তায় সাড়ে ৪ হাজার টাকায় পাঠিয়েছি। কিন্তু বেশিরভাগ রোগীরই ঢাকায় কেউ পরিচিত থাকেন না। ফলে তাদের স্বজনদের বিপদের মুখে জিম্মি হতে হয়।’
অবশ্য সফিকুজ্জামানের ভাষ্য, চাইলেই সেই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় নেই। কেননা পুরো বিষয়টি থাকে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। তবে সরকার যদি নীতিমালা করে, তাহলে মানুষের দুঃসময়কে পুঁজি করে কেউ ফায়দা হাসিল করতে পারবে না।
এদিকে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সামনের অ্যাম্বুলেন্সের চালক রাকিব হোসেন আগামীর সময়কে জানালেন, তাদের কোনো নির্ধারিত ভাড়া নেই। রোগীর স্বজনদের থেকে আলোচনার মাধ্যমে যে যত পারেন আদায় করে থাকেন। তবে ঢাকা থেকে জেলাভিত্তিক একটি অলিখিত রেট থাকে। যেমন ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম গেলে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা ভাড়া। এর ওপর যে যত টাকা আদায় করতে পারেন।
তবে একই ধরনের তথ্য দিলেন যশোর থেকে আসা দুই অ্যাম্বুলেন্সের চালক। তবে তারা রোগীর স্বজনদের জিম্মি করে ভাড়া আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করে বললেন, অনেক সময় গরীব রোগীকে শুধু তেলের দামে নিয়ে যাই।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানালেন, বিদ্যমান ‘সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২’-এর বিধি-৮১-এর ব্যাখ্যা অংশে অ্যাম্বুলেন্সের অর্থ উল্লেখ থাকলেও ওই বিধিমালায় অ্যাম্বুলেন্সের গঠন কাঠামো বা অ্যাম্বুলেন্সের আবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির বিষয়ে কোনো কিছু বলা নেই। ফলে ‘অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান সার্ভিস নীতিমালা-২০২৫’ তৈরির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এই নীতিমালার উদ্দেশ্য হলো একটি উচ্চ মানসম্পন্ন ও সেবাধর্মী অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান সার্ভিস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকারি হাসপাতালের সীমানার মধ্যে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং করা যাবে না। শুধু রোগী ওঠানামা করানোর জন্য হাসপাতাল সীমানার মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে। কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া এক কোম্পানির অ্যাম্বুলেন্সকে অন্য কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। এমনকি অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির মাধ্যমে পরিচালনা করার জন্য লিজ, চুক্তি বা আমমোক্তার (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) ইত্যাদি দেওয়া যাবে না। মাইক্রোবাস/ভ্যানজাতীয় মোটরযানকে স্থানীয়ভাবে রূপান্তর করে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি রোগীর স্বজনদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করাও যাবে না চালকদের।
খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, শুধু অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে আমদানি করা ও শুল্কায়িত এয়ার কন্ডিশন্ডের মোটরযানকে এই সার্ভিসে ব্যবহার করা যাবে। তবে লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের ক্ষেত্রে অধিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাশ সংরক্ষণ করা যায়, এমন যানকে (লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান) হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো বা বোর্ড অব ডিরেক্টরসের অনুমোদন অনুযায়ী নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের রোগী বহনের জন্য প্রাইভেট হিসেবে নির্দিষ্টসংখ্যক অ্যাম্বুলেন্স রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করে পরিচালনা করতে পারবে। স্থানীয় ট্রেড লাইসেন্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং রেজিস্টার্ড কোম্পানি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পরিচালনা করতে পারবে। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ধারা ৩১(১) অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ বিশেষ ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রুট পারমিট ছাড়াই অ্যাম্বুলেন্সকে অনুমতি দিতে পারবে। একটি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস প্রতিষ্ঠান কমপক্ষে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স থাকতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পরিচালনার জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিজস্ব পার্কিং গ্যারেজ (স্পেস) থাকতে হবে।
কোথায় কত ভাড়া হবে : ব্যক্তিগত, স্থানীয় ট্রেড লাইসেন্সভিত্তিক পরিচালিত সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া মহানগরীর মধ্যে প্রথম দুই কিলোমিটার সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা। এ ছাড়া পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ১০০ টাকা হবে। মহানগরীর বাইরে প্রথম দুই কিলোমিটার সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার বা তার অংশের জন্য ভাড়া ৪০ টাকা হবে। আইসিইউ ও সিসিইউ সন্নিবেশিত অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া মহানগরীর মধ্যে প্রথম দুই কিলোমিটার সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ১৫০ টাকা হবে। মহানগরীর বাইরে প্রথম দুই কিলোমিটার সর্বোচ্চ ২ হাজার এবং পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার বা তার অংশের জন্য ভাড়া ৮০ টাকা করে যোগ হবে।
লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের ভাড়া মহানগরীর মধ্যে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকা সার্ভিস চার্জ এবং পরের প্রতি কিলোমিটারে ৫০ টাকা করে যোগ হবে। যদি লাশ সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়, তবে ওয়েটিং চার্জ প্রতি ঘণ্টায় দিতে হবে ৫০০ টাকা। মহানগরীর বাইরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ এবং প্রতি কিলোমিটারের জন্য ৪০ টাকা হবে। যদি লাশ সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়, তবে ওয়েটিং চার্জ প্রতি ঘণ্টা ৫০০ টাকা নিতে পারবে।
পাশাপাশি যেসব সড়কে বা সেতুতে টোল নির্ধারিত রয়েছে, সেই টোল অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান ব্যবহারকারী বহন করবেন। এ ছাড়া সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অ্যাম্বুলেন্স বা লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের ভাড়ার হার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বা নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। তবে নীতিমালায় উল্লিখিত ভাড়ার বেশি হবে না।
সরকারি বা বেসরকারিভাবে নির্দিষ্ট কোনো হালনাগাদ তথ্য না থাকলেও বিভিন্ন সূত্র বলেছে, দেশে ছয় থেকে আট হাজার অ্যাম্বুলেন্স আছে। এর বড় অংশই পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারিভাবে। সরকারিভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে কিছু অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও অধিকাংশই থাকে নষ্ট। আবার সরকারি হাসপাতালে কিছু অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও একই অবস্থা।


