বিয়ের ফাঁদে চীনে বিক্রি আঞ্জুয়ারা/দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:

স্বপ্নের বিয়ে, দুঃস্বপ্নের পরিণতি: বিয়ের ফাঁদে চীনে নিয়ে ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি যশোরের আঞ্জুয়ারা

সুদূর চীন দেশে পাড়ি জমিয়ে সুখী দাম্পত্য জীবনের রঙিন স্বপ্ন বুনেছিলেন যশোরের মেয়ে আঞ্জুয়ারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। বিয়ের নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতে আঞ্জুয়ারাকে চীনে নিয়ে গিয়ে ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার এক লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বর্তমানে সুদূর চীনে বন্দিদশায় থাকা এই বাংলাদেশি তরুণী স্বদেশে ফিরে আসার জন্য আকুল আকুতি জানিয়েছেন।

যেভাবে পাতা হয় প্রতারণার ফাঁদ

অনুসন্ধানে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণীদের টার্গেট করে এক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র। আঞ্জুয়ারার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এক চীনা যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর দুই পরিবারের সম্মতিতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর আঞ্জুয়ারাকে একটি সুন্দর ও সচ্ছল জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে এবং উচ্চ বেতনে চাকরির ভুয়া আশ্বাস দিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়।

চীনে নিয়ে ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি

ভুক্তভোগী আঞ্জুয়ারার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চীনে পৌঁছানোর পরপরই তাঁর ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। তাঁর পাসপোর্ট, ভিসা এবং যোগাযোগের সব মাধ্যম কেড়ে নেওয়া হয়। পরে জানা যায়, তথাকথিত সেই চীনা স্বামী আসলে কোনো সাধারণ জীবনসঙ্গী নয়, বরং সে আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের একজন সক্রিয় সদস্য। আঞ্জুয়ারাকে চীনের একটি চক্রের কাছে প্রায় ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়।

বন্দিদশায় আঞ্জুয়ারা: দেশে ফেরার আকুতি

বর্তমানে আঞ্জুয়ারা চীনের একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সম্প্রতি কোনোভাবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমর্থ হলে এই পৈশাচিক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। একটি ভিডিও বার্তায় কাঁদতে কাঁদতে আঞ্জুয়ারা বলেন,

“আমাকে এখানে বিয়ের নামে ধোঁকা দিয়ে ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আমার ওপর প্রতিদিন নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আমি আমার দেশে, আমার পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চাই। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, দয়া করে আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করুন।”

বাড়ছে ‘চায়না ম্যারেজ’ সিন্ডিকেটের তৎপরতা

সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ‘চায়না ম্যারেজ’ বা চীনা যুবকদের সঙ্গে বিয়ের নামে এক ধরনের শক্তিশালী মানব পাচার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই চক্রগুলো গ্রামীণ বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সরলতার সুযোগ নিয়ে এবং অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের পাচার করছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের পতিতালয় কিংবা জোরপূর্বক শ্রমের মতো অন্ধকার জগতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও আইনি প্রক্রিয়া

যশোরের স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আঞ্জুয়ারাকে উদ্ধার এবং এই আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের দেশীয় এজেন্টদের চিহ্নিত করতে সরকারের উচ্চপর্যায় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

পারিবারিক সুখের আশায় ভিনদেশি যুবকদের বিয়ে করার ক্ষেত্রে দেশের তরুণী ও তাঁদের অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন ও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ডেস্ক রিপোর্ট, দৈনিক পূর্বাচল।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 5   +   4   =