এক ঘন্টায় বিনিয়োগকারীদের উধাও প্রায় ৮ লাখ কোটি রুপি

ভারতের শেয়ারবাজারে বৃহস্পতিবার সকালে তীব্র বিক্রির চাপ দেখা গেছে। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৮ লাখ কোটি রুপির (৭.৬ লাখ কোটি) সম্পদ উধাও হয়ে গেছে। বাজার খোলার পর বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট বাজারমূল্য কমে ৪৩০.৯৯ ট্রিলিয়ন রুপিতে নেমে আসে। যা আগের দিন বুধবারের সমাপনীতে ছিল ৪৩৮.৬৩ ট্রিলিয়ন রুপি। দুই প্রধান সূচকই লেনদেনের শুরুতেই ২ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। বিএসই সেনসেক্স ১,৫৪৮.৮৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৭৫,১৫৫.২৮তে। ৪৫৮.৩৫ পয়েন্ট কমে এনএসই নিফটি ৫০ দাঁড়ায় ২৩,৩১৯.৪৫তে। বাজারের এই বড় পতনের পেছনে একক কোনো কারণ নয়; বরং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চাপ একসঙ্গে কাজ করেছে। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের টাকা তুলে নেয়া এবং দুর্বল বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি।
সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক ধাক্কা এসেছে অপরিশোধিত তেলের বাজার থেকে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১০ ডলার অতিক্রম করেছে। এর পেছনে রয়েছে ইরান ও কাতারের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর সাম্প্রতিক হামলা। ভারতের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য তেলের দাম বেড়ে গেলে দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি পায় এবং করপোরেট কোম্পানিগুলোর মুনাফায় চাপ পড়ে। বাজারের অংশগ্রহণকারীরা আশঙ্কা করছেন, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১১০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে ২০২৭ অর্থবছরের আয়ের পূর্বাভাসও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও দ্রুত খারাপ হয়েছে। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে হামলা এবং কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ক্ষতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। ফলে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ব্যাংকিং শেয়ারে বড় পতন
বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে বড় আর্থিক খাতের শেয়ার। এইচডিএফসি ব্যাংক-এর শেয়ার একাই সেনসেক্সকে ৩৭৩ পয়েন্ট নিচে নামিয়েছে। তাদের শেয়ার ৩.৬৫ শতাংশ কমে ৮১২.৫০ রুপিতে নেমেছে। এছাড়া আইসিআইসিআই ব্যাংক, অ্যাক্সিস ব্যাংক মিলে সূচক থেকে আরও ২২০ পয়েন্ট কমিয়ে দেয়। অন্যান্য বড় পতন হওয়া কোম্পানির মধ্যে রয়েছে লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, বাজাজ ফাইন্যান্স, ইটার্নাল লিমিটেড। এ থেকে দেয়া যায় যে এই পতন কোনো একক খাতের নয়, বরং পুরো বাজারজুড়ে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।
এমন অবস্থায় বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (এএফপিআই) ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। এ মাসে মাত্র ১২টি ট্রেডিং সেশনে তারা ৭৭,২১৪ কোটি রুপির শেয়ার বিক্রি করেছেন। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬,৪০০ কোটি রুপি। এই ধারাবাহিক অর্থপাচার শেয়ারবাজারের পাশাপাশি রুপির ওপরও চাপ তৈরি করছে এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২ শতাংশের বেশি কমেছে নিক্কেই ২২৫। হ্যাং সেং, কসপি এগুলিও নিম্নমুখী ছিল। এর আগে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক কম্পোজিট-ও পতনের মধ্যেই লেনদেন শেষ করে।
সুদের হার কমায়নি ফেড
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ৩.৫-৩.৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। ফেডের বার্তা স্পষ্ট। তাহলো শিগগিরই সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নেই। এতে বৈশ্বিক বাজারে তারল্য কমে যায় এবং ভারতসহ উদীয়মান বাজারগুলো কিছুটা কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বর্তমান বাজার সংশোধন মূলত বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে হয়েছে, দেশের মৌলিক অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে নয়। তবে এই তীব্র পতন দেখাচ্ছে যে বিশ্বব্যাপী ঝুঁকির প্রতি বাজার কতটা সংবেদনশীল। যদি তেলের দাম স্থিতিশীল হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমে, তাহলে বাজার আবার সমর্থন পেতে পারে। কিন্তু এসব চাপ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বল্পমেয়াদে বাজারে অস্থিরতা উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।
ইনভেস্টরএআই-এর সিইও ব্রুস কিথ বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও তেলের দাম বাড়ার কারণে ঝুঁকির মাত্রা দ্রুত বেড়েছে এবং এর প্রভাব ভারতীয় বাজারেও পড়ছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment