ইরান এখন চালাচ্ছে কে?

ইসরাইলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার ১৭ দিন পর আবারো ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতে উচ্চপর্যায়ের হত্যাকাণ্ড। আলি লারিজানি, গোলামরেজা সোলায়মানির মতো শীর্ষ নেতাদের হত্যার ঢেউয়ে কেঁপে উঠছে তেহরানের মাটি। ইসরাইল হত্যা করেছে একসময় ইরানের দ্বিতীয় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত আলি লারিজানিকে। বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলায়মানিকে। এই হামলাগুলোর মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান, ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কমান্ডার এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীও। এমনি করে নেতৃত্ব শূন্য করে ফেলা হচ্ছে ইরানকে। তারপরও ইরান যুদ্ধে তার অবস্থান বদলায়নি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে ইরানকে পরিচালনা করছে কে?

বুধবার ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ আরও একজন বড় নেতাকে হত্যার বিষয় নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, রাতভর হামলায় ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাাইল খাতিব নিহত হয়েছেন। এই অভিযানের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে কাটজ সতর্ক করে বলেন, অভিযান এখনও শেষ হয়নি। তিনি বলেন, আজ সারাদিন বিভিন্ন ফ্রন্টে বড় ধরনের চমক দেখা যেতে পারে। আমরা তাদের সবাইকে প্রতিহত করব এবং খুঁজে বের করে নির্মূল করব।

জনসমক্ষে নেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা

এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২৬ সালের ৯ মার্চ ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে মোজতবা খামেনিকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে। তবে তার পিতা, স্ত্রী এবং ছেলে নিহত হওয়ার যে হামলার কথা বলা হচ্ছে- তার পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তার এই অনুপস্থিতি দেশটির প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসছে আইআরজিসি

এই অনিশ্চয়তার কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। এই সংগঠনটিকে বহুদিন ধরেই ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বিশাল সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের কারণে তাদেরকে এমনভাবে বর্ণনা করা হয়। পাশাপাশি বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড কাঠামোর জন্য আইআরজিসি নেতৃত্বের বড় ধাক্কা সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে অনন্য অবস্থানে রয়েছে। ধারাবাহিক নেতৃত্ব লক্ষ্য করে হামলার পর এবং মোজতবা খামেনি আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ায় আইআরজিসি এখন উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। বাস্তবে তারা অনেকটা সামরিক জান্তার মতো কাজ করছে- যুদ্ধকালীন কৌশল নির্ধারণ করছে এবং বেসামরিক সরকারের প্রভাবকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

সাদেক লারিজানি

এখন নজর পড়েছে সাদেক লারিজানির দিকে। তিনি নিহত আলি লারিজানির ভাই এবং ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর একজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। বর্তমানে তিনি এক্সপেডিয়েন্সি ডিসার্নমেন্ট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী নেতা হিসেবে উঠে এসেছেন। ইসরাইলভিত্তিক গবেষণা সংস্থা মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ইগাল কারমোন মনে করেন, সাদেক লারিজানি আইআরজিসির কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হতে পারেন। তিনি বলেন, আইআরজিসি এমন একজন কঠোরপন্থী নেতা চাইবে যিনি তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলবেন। কারমোন বলেন, তিনি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী নন; বরং তাদের সঙ্গে কাজ করবেন।

মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ

ক্ষমতার এই প্রতিযোগিতায় আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি বর্তমানে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং দীর্ঘদিনের আইআরজিসি ঘনিষ্ঠ। আইআরজিসির বিমানবাহিনীর সাবেক কমান্ডার হিসেবে তার সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তাকে প্রায়ই পার্লামেন্টে ‘আমেরিকা নিপাত যাক! ইসরাইল নিপাত যাক!’ স্লোগান দিতে দেখা গেছে।

আনুষ্ঠানিক অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব

আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর দেশ পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করেছে। এই পরিষদে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা আলিরেজা আরাফি এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই।

ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ভবিষ্যৎ

তবে পর্দার আড়ালে ইরানের রাজনৈতিক শিবির বিভক্ত রয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা করার পক্ষে জোর দিয়েছিলেন আইআরজিসি কমান্ডার আহমাদ বাহিদ। তার মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি শক্ত প্রতীকী বার্তা হবে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী গোষ্ঠীগুলো আপত্তি জানায়। তারা সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, হাসান খোমেনি এবং আলিরেজা আরাফির মতো তুলনামূলক মধ্যপন্থী ব্যক্তিদের সমর্থন করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের ফলে ইরানের ক্ষমতার কাঠামো আরও কঠোর ও র‌্যাডিক্যাল হয়ে উঠতে পারে। জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ভালি নাসর সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন – ইরানের নেতৃত্বে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড দেশটির নেতৃত্বকে আরও কঠোরপন্থী করে তুলছে। তার মতে, এর ফলে ইরান, ইরানের জনগণ এবং পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হয়ে উঠতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা আরও কঠিন হয়ে পড়বে

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment