গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর তেল ও গ্যাসের দাম লাফিয়ে বেড়েছে

ব্রেন্ট ক্রুডসহ বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম আবার বেড়ে গেছে। ইরান ও ইসরাইল একে অপরের গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালানোর পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হতে পারে। এই আশঙ্কায় বাজারে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশ্বের প্রধান তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করার পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। ইউরোপেও গ্যাসের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। নেদারল্যান্ডসের পাইকারি গ্যাসের দাম ২৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেগাওয়াট ঘণ্টায় ৬৮ ইউরো হয়েছে, যা ২০২২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বোচ্চ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। বৃটেনে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে গ্যাসের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে, যা গৃহস্থালির বিল বাড়িয়ে দিতে পারে। বৃহস্পতিবার সকালে বৃটেনে আগাম পাইকারি গ্যাসের দাম ২৩ শতাংশ বেড়ে ১৭২ পেন্স প্রতি থার্ম হয়েছে। এটি ২০২২ সালের আগস্টের পর সর্বোচ্চ। যদিও এটি এখনও ২০২২ সালের মার্চে অল্প সময়ের জন্য ছুঁয়ে যাওয়া ৮০০ পেন্স প্রতি থার্ম-এর সর্বোচ্চ রেকর্ডের অনেক নিচে রয়েছে।
বাজারে এই প্রতিক্রিয়ার কারণ মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের দ্রুত বৃদ্ধি। ইরান জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে। ফলে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। এই হামলা ছিল ইসরাইলের ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ড-এ হামলার প্রতিশোধ। তেল ও গ্যাসের দাম হঠাৎ বাড়ার ফলে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে আবার বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এশিয়ায় শতকরা ৩.৪ ভাগ কমেছে নিক্কেই ২২৫ এর দাম। কসপি ২.৭ ভাগ কমেছে। হ্যাং সেং শেয়ারের দাম কমেছে শতকরা ২ ভাগ।
ইউরোপের বাজারও একই অবস্থা দেখা গেছে। সেখানে শতকরা ১.৮ ভাগ কমেছে এফটিএসই ১০০-এর দাম। ড্যাক্সের শেয়ারের দাম কমেছে শতকরা ২.৩ ভাগ। সিএসি ৪০ কমেছে ১.৭ ভাগ। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি আবার কাতারে হামলা চালায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র ‘সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা যুদ্ধের বড় ধরনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি কাতারএনার্জি জানিয়েছে, ইরানের হামলায় রাস লাফান স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেনজি সতর্ক করেছে যে কাতারের এলএনজি হাবে হামলা বৈশ্বিক গ্যাসবাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, সেখানে দুই মাসের মতো সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। কিন্তু এখন মনে করা হচ্ছে এই সময় আরও বাড়তে পারে। প্রতিটি অতিরিক্ত মাস বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ থেকে প্রায় ১.৫ শতাংশ কমিয়ে দেয়। বৃটিশ জ্বালানি কোম্পানি শেল জানিয়েছে, রাস লাফান হামলায় তাদের পার্ল জিটিএল প্ল্যান্ট (গ্যাস-টু-লিকুইডস) স্থাপনায় ক্ষতি হয়েছে। তবে কোম্পানিটি জানায়, আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। প্রতিশোধমূলক হামলায় ইরান এই স্থাপনায় আঘাত করে। আবুধাবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানি হামলার কারণে তাদের হাবশান গ্যাস ফ্যাসিলিটি এবং বাব অয়েলফিল্ড-এর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ ক্লাব-এর প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ায় জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কার আশঙ্কা আবার সামনে এসেছে। উভয় পক্ষ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা বাড়ানোয় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাবনা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তিনি সতর্ক করেন, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে, এমন আশঙ্কাও আবার সামনে এসেছে। তিনি বলেন, ইউরোপ বিশেষভাবে কাতারের এলএনজি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। কারণ অনেক দেশ রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে।
বৃহস্পতিবার বড় ইউরোপীয় বিমান সংস্থা যেমন লুফথানসা সতর্ক করেছে, জ্বালানি মূল্য দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে বিমানভাড়া বাড়তে পারে। এয়ারলাইন্সগুলো যাত্রীদের আগেভাগে টিকিট বুক করার পরামর্শ দিয়েছে। কারণ জ্বালানি দামের বিরুদ্ধে তাদের সুরক্ষা কৌশল ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আরএসএম ইউকে-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ থমাস পিউ বলেন, জ্বালানি দামের বৃদ্ধি তথাকথিত দ্বিতীয় ধাপের মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করতে পারে- যেখানে মজুরি ও পণ্যের দাম একসঙ্গে বাড়তে শুরু করে। তিনি বলেন, যদি গ্রীষ্ম পর্যন্ত জ্বালানি দাম এত বেশি থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। তখন ব্যাংক অব ইংল্যান্ড-এর জন্য সুদের হার বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না। ফলে সুদের হার কমানোর বদলে অর্থবাজার এখন জুলাইয়ের মধ্যে ০.২৫ শতাংশ হার বাড়ার সম্ভাবনা ধরে নিচ্ছে, যা ব্যাংক রেটকে আবার ৪ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে।
সমুদ্রবাণিজ্য বিশ্লেষণ সংস্থা লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স-এর প্রধান সম্পাদক রিচার্ড মীড বলেন, চলমান গ্যাসক্ষেত্রে প্রথম নিশ্চিত হামলা সংঘাতের বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। এর ফলে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় হামলার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এতে রপ্তানি টার্মিনাল, সমুদ্রের অবকাঠামো, বন্দর প্রবেশপথ ও সামরিক স্থাপনাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তিনি বলেন, এখন শুধু হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ নয়, নোঙর করা জাহাজও নিরাপদ নাও থাকতে পারে। চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইরাক ও মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশ নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সরাসরি ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তবে মীড সতর্ক করে বলেন, শুধু অর্থ প্রদান বা জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিরাপদ পথ পাওয়া যাবে—এমন ধারণাকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment