স্কুলশিক্ষক থেকে কুখ্যাত ধনকুবের: জেফরি এপস্টেইন কীভাবে ক্ষমতাবানদের ঘনিষ্ঠ হলেন

জেফরি এপস্টেইন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক ও বিতর্কিত অর্থলগ্নিকারী। নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এপস্টেইন ১৯৭০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহরের একটি অভিজাত প্রাইভেট স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। তিনি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, তবে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি।

এক শিক্ষার্থীর ধনী অভিভাবকের মাধ্যমে এপস্টেইনের জীবনে বড় সুযোগ আসে। ওই অভিভাবক তাঁকে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ ব্যাংক বিয়ার স্টিয়ার্নসের এক জ্যেষ্ঠ অংশীদারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এর ফলেই এপস্টেইন ব্যাংকটিতে যোগ দেন এবং মাত্র চার বছরের মধ্যে অংশীদার পদে উন্নীত হন—যা তাঁর অস্বাভাবিক দ্রুত উত্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

১৯৮২ সালে তিনি নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠান জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি কেবল অতি ধনী গ্রাহকদের সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিত, যাঁদের সম্পদের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। এই ব্যবসার মাধ্যমে এপস্টেইন বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন এবং ফ্লোরিডা, নিউ মেক্সিকো, নিউইয়র্ক ও ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসে বিলাসবহুল সম্পত্তি গড়ে তোলেন।

অর্থনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর সামাজিক যোগাযোগও বিস্তৃত হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রু এবং হলিউডের কয়েকজন তারকার সঙ্গে তাঁর ওঠাবসার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। যদিও এসব সম্পর্ক থাকা মানেই তাঁরা অপরাধে জড়িত ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত জীবনের আড়ালে চলছিল ভয়াবহ অপরাধ। ২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়। পরে অভিযোগ ওঠে, তিনি বহু বছর ধরে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নিপীড়ন ও পাচারের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিলেন। তদন্তে ডজনের বেশি ভুক্তভোগীর সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

২০০৮ সালে বিতর্কিত এক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে এপস্টেইন ফেডারেল মামলার হাত থেকে রেহাই পান। সম্ভাব্য আজীবন কারাদণ্ডের পরিবর্তে তাঁকে মাত্র ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যার বড় অংশ তিনি দিনের বেলায় বাইরে কাজ করার সুযোগ পান। এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হিসেবে দেখা হয়।

২০১৯ সালে যৌন পাচারের অভিযোগে আবারও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচার চলাকালেই ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। সরকারি প্রতিবেদনে একে আত্মহত্যা বলা হলেও তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্ন ও সন্দেহ এখনো রয়ে গেছে।

এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সাবেক প্রেমিকা গিলেন ম্যাক্সওয়েল গ্রেপ্তার হন। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নিপীড়নে সহায়তার দায়ে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ পাস হলে তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া তদন্তসংক্রান্ত লাখ লাখ নথি প্রকাশ পেতে শুরু করে। এসব নথি এপস্টেইনের জীবনকে শুধু একজন অপরাধীর গল্প নয়, বরং ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব কীভাবে দীর্ঘদিন বিচার এড়িয়ে যেতে পারে—তার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment