ফিলিপাইন ও আশপাশের অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশেও বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভূতত্ত্ববিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দেশের বিভিন্ন সক্রিয় ভূ-ফাটলে দীর্ঘদিন ধরে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন একটি ভূ-অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ৮ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে ডাউকি ফল্টসহ বিভিন্ন সক্রিয় ভূ-চ্যুতি এলাকায় জমে থাকা শক্তি বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অবজারভেটরির সাবেক পরিচালক ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চলের নিচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত রয়েছে। ওই এলাকায় বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তার গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় মাত্র ১ শতাংশ ভবন ধসে পড়লেও প্রায় ৬ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং প্রায় ৩ লাখ মানুষ হতাহত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এর আগে ২০০৯ সালে জাইকা ও সিডিএমপির যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছিল, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং এক লাখেরও বেশি ভবন আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিল্ডিং কোড না মানা, দুর্বল নির্মাণ মান এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতি—সব মিলিয়ে ভূমিকম্প ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, ঢাকার মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ ভবন ভূমিকম্প সহনশীল। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো শনাক্ত করে ধাপে ধাপে শক্তিশালী করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ভবনগুলোকে ভূমিকম্প-সহনশীল করা গেলে সম্ভাব্য প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, নিয়মিত মহড়া, উদ্ধার প্রশিক্ষণ, স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতি এবং জনসচেতনতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আধুনিক সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভূমিকম্প বিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো গেলে বড় ধরনের বিপর্যয় অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তাদের মতে, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতাই হতে পারে প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

