স্পোর্টস ডেস্ক | দৈনিক পূর্বাচল
৯ জুন ২০২৬
খেলা মাঠে গড়ানোর আগেই মাঠের বাইরের নানা বিতর্ক ও ভূ-রাজনীতিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি আফ্রিকার বর্ষসেরা রেফারি ওমর আব্দুল কাদির আরতান। শনিবার (৭ জুন) দক্ষিণ ফ্লোরিডার মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে দেশে ঢুকতে না দিয়ে ফেরত পাঠায়।
ফিফার চূড়ান্ত ৫২ জন বিশ্বকাপ রেফারির তালিকায় থাকা আরতান যদি ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পেতেন, তবে তিনিই হতেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে ম্যাচ পরিচালনাকারী প্রথম সোমালি রেফারি। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের এই নিষেধাজ্ঞার পর ফিফা নিশ্চিত করেছে, এবারের বিশ্বকাপে আর ম্যাচ পরিচালনা করা হচ্ছে না তাঁর।
আমেরিকার কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) আল জাজিরা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর কাছে আরতানকে প্রবেশাধিকার না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সিবিপির এক মুখপাত্র জানান, “নিয়মিত পরীক্ষার পর যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত গভীর উদ্বেগের (Vetting Concerns) কারণে আরতানকে মার্কিন ভূখণ্ডে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়েছে এবং প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি।”
যদিও আরতানের কাছে বৈধ মার্কিন ভিসা এবং সোমালি সরকারের কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল, তবুও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বলি হতে হলো তাঁকে। উল্লেখ্য, গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের জারি করা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ৩৯টি দেশের মধ্যে সোমালিয়া অন্যতম, যেখানে সোমালি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ প্রায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্বাগতিক দেশের ইমিগ্রেশন বা ভিসা প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই। ফলে আরতানের বিশ্বকাপ স্বপ্ন এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
চলতি বিশ্বকাপে এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হওয়া একমাত্র ব্যক্তি আরতান নন। ইরানের জাতীয় ফুটবল দলকেও একই ধরনের ভিসা জটিলতার কারণে তাদের বিশ্বকাপ বেস ক্যাম্প করতে হয়েছে মেক্সিকোতে। ম্যাচ খেলার জন্য তারা আমেরিকায় আসার অনুমতি পেলেও, খেলা শেষেই তাদের মেক্সিকোতে ফিরে যেতে হবে। এমনকি ইরান দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও স্টাফকে মার্কিন ভিসাই দেওয়া হয়নি। এছাড়াও সুইজারল্যান্ডের তারকা মিডফিল্ডার ব্রিল এমবোলোসহ একাধিক ফুটবলার ও কর্মকর্তা মার্কিন মুলুকে পা রাখতে গিয়ে চরম জটিলতায় পড়েছেন।
বিশ্বকাপ চলাকালে নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন মার্কিন শহরে অভিবাসন ও শুল্ক বলবৎকরণ বিভাগের (ICE) এজেন্ট ও কড়াকড়ি বাড়ানোর ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে মামদানি লেখেন, “অভিবাসীরা ছাড়া ফুটবলের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। অভিবাসীরাই এই খেলায় অংশ নেন, কোচিং করান, মাঠ প্রস্তুত করেন এবং গ্যালারি ভরিয়ে বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক উৎসবকে সফল করে তোলেন। খোদ আমেরিকার পুরুষ জাতীয় দলেই ছয়জন ফুটবলার আছেন যারা অভিবাসী।”
তিনি আরও যোগ করেন, “বিশ্ব যখন আমাদের দেশে অতিথি হয়ে আসছে, তখন আমরা আইসিই বা অন্য কাউকে আমাদের সমাজ ও ক্রীড়াঙ্গনে ভয় ছড়াতে দেব না। আমরা গর্বের সঙ্গে আমাদের অভিবাসী প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়াব এবং এই বিভাজনের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করব।”
কয়েক মাস আগে মোগাদিশুতে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই ঐতিহাসিক সুযোগ নিয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন আরতান। সোমালিয়ার দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ভেতর থেকে উঠে এসে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করাকে জীবনের সবচেয়ে বড় ‘সম্মান’ বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।
২০২৫ সালে আফ্রিকার সেরা রেফারি নির্বাচিত হওয়া আরতান বলেছিলেন, “রেফারি হিসেবে হার মানা চলে না। একটি লক্ষ্য থাকতে হয়। আমার এই লক্ষ্য ছিল, তবে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না।” কিন্তু মাঠের রেফারি হিসেবে হার না মানলেও, মাঠের বাইরের ভূ-রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে শেষ পর্যন্ত থমকে গেল এই সোমালি রেফারির বিশ্বকাপ যাত্রা।
#FIFAWorldCup2026 #OmarArtan #SomaliReferee #USImmigration #TrumpTravelBan #FootballPolitics #DailyPurbachal #SportsNews

